জ্ঞানের স্বর্ণযুগে নৈতিক অবক্ষয়

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৪ এএম

আমরা জ্ঞান ও তথ্যের স্বর্ণযুগে বাস করছি। মানুষের জ্ঞানচর্চা এখন শুধু পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষ পৃথিবীর সীমা পেরিয়ে মহাকাশের বুকে পদচারণা করছে। চাঁদ থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশেও পড়েছে তার পদচিহ্ন। প্রযুক্তির উৎকর্ষ মানুষকে এনে দিয়েছে অভাবনীয় সুবিধা, জীবনকে করেছে সহজ, দ্রুত ও বহুমাত্রিক।

কিন্তু এই চমকপ্রদ বাহ্যিক অগ্রগতির অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বেদনা, নিঃশব্দ আর্তনাদ। তা হলো মানবতার নৈতিক অবক্ষয়। জ্ঞানের বিস্তার ঘটলেও এখন মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধি হচ্ছে না, বরং দিন দিন মানুষের চরিত্র, লজ্জাশীলতা ও নৈতিকতা ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে, ততই যেন বিবেক ও আল্লাহভীতি পিছিয়ে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্যই আজকের সভ্যতার সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।

ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞান : ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞান কেবল তথ্যের সঞ্চয় বা প্রযুক্তির উৎকর্ষের নাম নয়, বরং জ্ঞান হলো সেই নুর, যা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে এবং তাকে তার স্রষ্টার দিকে পরিচালিত করে। যখন জ্ঞান এই বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে খালি হয়, তখন তা কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জ্ঞানই তখন হয়ে উঠে মানবতার ধ্বংসের হাতিয়ার, যেমনটি আমরা আজ বিশ্বজুড়ে প্রত্যক্ষ করছি।

বর্তমানে আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তথ্যের ছড়াছড়ি বাড়ছে, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান দিন দিন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, কথিত শিক্ষার কার্যক্রম প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু চরিত্র গঠনের আগ্রহ তলিয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক ব্যাধি : আজকের দুনিয়ায় চিকিৎসা বিজ্ঞান অভাবনীয় উন্নতি করেছে। এক সময় যেসব রোগ মহামারী হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সেগুলো খুবই নিরীহ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, শারীরিক চিকিৎসা বাড়লেও মানুষের মানসিক ও আত্মিক ব্যাধি বহুগুণ বেড়েছে এবং এই বৃদ্ধির মাত্রা বেড়েই চলছে।

মানুষের স্বেচ্ছাচারী রাজনীতি, ক্ষমতার দাপট এবং অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের লালসা এমন সব জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যার সমাধান কোনো ল্যাবরেটরিতে নেই। লোভ, হিংসা ও ভোগবাদিতার কারণে মানুষ আজ বিষণœতা, উৎকণ্ঠা ও আত্মিক শূন্যতায় ভুগছে। চিকিৎসকরা শরীরের রোগ সারাতে পারলেও মনের পচন রোধ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম।

যন্ত্রের উৎকর্ষ ও প্রজ্ঞার বিনাশ : আমাদের নিকট আজ অপরাধ শনাক্ত করার জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। লাই ডিটেক্টর দিয়ে মিথ্যা ধরা যায়, ডিএনএ টেস্ট দিয়ে অপরাধী শনাক্ত করা যায়, এমনকি স্মার্ট ওয়াচ দিয়ে হৃদস্পন্দনও মনিটরিং করা যায়। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, যন্ত্রের এই নির্ভুলতার মাঝে মানুষের বিবেকটাই আজ সবচেয়ে বেশি ভুল করছে। মানুষের হেকমত বা প্রজ্ঞা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ তথ্যের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে, অথচ হেকমত দিয়ে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

হাদিসের সতর্কবাণী : রাসুলুল্লাহ (সা.) কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে বলতে গিয়ে জ্ঞান উঠে যাওয়া এবং অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কেয়ামতের আগে ইলম তুলে নেওয়া হবে এবং অজ্ঞতা জেঁকে বসবে।’ (সহিহ বুখারি)

এখানে ইলম বলতে কেবল তথ্য নয়, বরং সেই জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দেয় এবং নৈতিকতা শেখায়। আজ মানুষ তাথ্যিক হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই তথ্য ইলমের রূপ নিয়ে তার অন্তরকে আলোকিত করতে পারছে না।

শিক্ষিত মহলের দায়ভার : সবচেয়ে ভীতির বিষয় হলো, বর্তমানে কথিত শিক্ষিত শ্রেণিই মানবতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে মনে করা হতো, মানুষ মূর্খ বলেই অপরাধ করে। কিন্তু বর্তমান চিত্র ভিন্ন। আজ বড় বড় যুদ্ধ, অর্থনৈতিক শোষণ, সাইবার অপরাধ এবং পরিবেশ ধ্বংসের পেছনে রয়েছে উচ্চশিক্ষিত ও তথ্যসমৃদ্ধ মস্তিষ্ক।

যাদের হাত ধরে শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, তাদের হাত মানুষের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। কারণ জ্ঞানের সঙ্গে যদি খোদাভীতি না থাকে, তখন সেই জ্ঞান শয়তানের অস্ত্রে পরিণত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এমন জ্ঞান থেকে পানাহ চাই, যা কোনো উপকারে আসে না।’ (সুনানু নাসায়ি)

আজকের পৃথিবীতে আমরা ঠিক সেই উপকারহীন ও ক্ষতিকর জ্ঞানের আস্ফালনই দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষিত মানুষ যখন তার মেধা দিয়ে অন্যকে ঠকানোর ফন্দি আঁটে, তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না, মানবতার পতন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

মানবিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষয় : যন্ত্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা মানুষকে যান্ত্রিক করে তুলছে। আবেগ, সহানুভূতি, দয়া ও ত্যাগের মতো মহৎ গুণগুলো লোপ পেতে শুরু করছে। মানুষ এখন রোবটের মতো কাজ করছে, কিন্তু তার হৃদয়ে মানুষের জন্য ভালোবাসা নেই। প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা হারিয়ে সে এখন কেবল লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষে।

সমাধানের পথ : তথ্যের এই উত্থানকে যদি মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করতে হয়, তাহলে শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার সংযোগ ঘটাতে হবে। কেবল পার্থিব শিক্ষা মানুষকে দক্ষ চোর বা বুদ্ধিমান অপরাধী বানাতে পারে, কিন্তু একজন ভালো মানুষ বানাতে পারে না।

সভ্যতার শিখরে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। আমরা কি কেবল যন্ত্রের উন্নতিকেই সভ্যতা বলব, নাকি মানুষের নৈতিক উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেব? জ্ঞান তখনই মানুষের জন্য কল্যাণ হয়, যখন তা মানুষের সেবায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে ব্যয় হয়। অন্যথায়, এই জ্ঞানই হবে আমাদের ধ্বংসের মূল কারণ।

মানবতার পতন রোধ করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মহান শিক্ষার কাছে, যা মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা দিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সঙ্গে যদি আমরা কোরআনের মূল্যবোধ ও নববী আদর্শের সমন্বয় করতে না পারি, তাহলে আমাদের এই তথাকথিত শিক্ষিত সমাজই একদিন পুরো পৃথিবীকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে। জ্ঞানের উত্থান যেন মানবতার পতন না ঘটায়, বরং তা যেন হয় মানুষের আত্মিক ও বৈষয়িক মুক্তির সোপান, এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক : মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত