হবিগঞ্জের ঐতিহাসিক শংকরপাশা শাহী মসজিদ

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৩ এএম

বাংলাদেশে সুলতানি আমলের অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর অন্যতম হবিগঞ্জের রাজিউড়া ইউনিয়নের উচাইল গ্রামের শংকরপাশা শাহী মসজিদ। হজরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট বিজয়ের পর তার যে ১২ জন সহকর্মীকে তরফ অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য পাঠান, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শাহ মজলিশ আমিন (রহ.)। তিনিই এখানে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন।

হবিগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি পাঁচশ বছরের ইতিহাসের ধারক। টিলার ওপর নির্মিত বলে অনেক দূর থেকে সহজেই দর্শনার্থীদের নজরে পড়ে এবং মসজিদের চমৎকার নির্মাণশৈলী সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। নির্মাণের সময় উন্নত মানের পোড়া ইট কেটে ইমারতে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের দেয়ালের গায়ে কোনো প্রলেপ নেই। দেয়ালের বাইরে পোড়া ইটের ওপর রয়েছে বিভিন্ন নকশা।

মসজিদের সঙ্গেই রয়েছে একটি শিলালিপি, যা প্রাচীনকালের সাক্ষ্য বহন করে। মসজিদটি লাল রঙের বলে অনেকে লাল মসজিদও বলে থাকেন। আবার টিলার ওপর বলে কেউ কেউ টিলা মসজিদ বলেন। দুটি মিলিয়ে লাল টিলা মসজিদও বলা হয়। তবে যে নামেই ডাকা হোক, সবাই খুব সহজেই মসজিদটিকে চিনতে পারেন। এ ছাড়া স্থানীয়রা এই মসজিদকে গায়েবি মসজিদ বলেও ডাকে।

উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৫১৩ সালে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়া এই মসজিদটি নির্মাণ করেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও শাহ জালাল (রহ.)-এর সহকর্মী শাহ মজলিশ আমিন। মসজিদের পাশেই আছে তার মাজার। কালের বিবর্তনে এক সময় মসজিদসংলগ্ন এলাকা বিরান ভূমিতে পরিণত হয়ে জঙ্গলবেষ্টিত হয়ে পড়লেও পরবর্তীকালে এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠলে জঙ্গলে আবাদ করতে গিয়ে বের হয়ে আসে ঐতিহাসিক এই মসজিদটি।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর আগে ১৪৯৩ সালে মসজিদটি প্রথম নির্মাণ করা হয়। তবে স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের বর্ণনা অনুযায়ী, মসজিদটি প্রায় ৭০০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন কারণে মসজিদটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে পরবর্তীকালে পুনর্নির্মাণ করা হয়। শেষবার পুনর্নির্মাণ করা হয় ১৯১৩ সালে। মসজিদটির বর্তমান রূপই হচ্ছে পুনর্নির্মিত রূপ।

অন্য আরেক বর্ণনায় জানা যায়, শাহ মজলিস আমিন (রহ.) মসজিদটি স্থাপন করেন। মতান্তরে তিনি এ মসজিদ পুনর্নির্মাণে হাত দেন। পরবর্তীকালে এই মসজিদের সুদৃশ্য ইমারত নির্মাণ করা হয় মুসলিম বাংলার শাসনকর্তা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর আমলে।

ইমারতটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ একই মাপের, ২১ ফুট ৬ ইঞ্চি। বারান্দা ৩ ফুটের সামান্য বেশি। এটিকে চারগম্বুজ মসজিদও বলা হয়। মূল ভবনের ওপর একটি বড় গম্বুজ এবং বারান্দার ওপর তিনটি ছোট গম্বুজ রয়েছে। দরজা-জানালা আছে প্রায় ১৫টি। দরজা ও জানালা প্রায় একই আকৃতির।

মসজিদের তিন দিকের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৫ ফুট আর পশ্চিম দিকের দেয়ালের পুরুত্ব এর প্রায় দ্বিগুণ। মসজিদটির প্রধান কক্ষের চার কোণে ও বারান্দার দুই কোণে মোট ছয়টি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভ আছে। ওপরের ছাদ আর প্রধান প্রাচীরের কার্নিশ নির্মাণ করা হয়েছে বাঁকানোভাবে।

মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে বড় একটি দীঘি। এটি মসজিদের সৌন্দর্য যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদের পাশেই আছে একটি মিনার। এটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। বারান্দার বাইরে পর্যটকদের জন্য বসার ব্যবস্থা আছে। আছে ফ্যান, লাইট ও পানির ব্যবস্থাও।

এখানে যাওয়ার উপায় হলো, সিলেটগামী যেকোনো ট্রেন বা বাসে করে প্রথমে শায়েস্তাগঞ্জ। তারপর প্রাইভেটকার বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ করে সরাসরি শংকরপাশা শাহী মসজিদে যাওয়া যায়। এটিই সবচেয়ে সহজ পথ। যারা নৌকা ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক, তাদের ঢাকা থেকে বাসে এলে শায়েস্তাগঞ্জের আগের স্টপেজ সুতাং বাজার নামতে হবে। সেখান থেকে নৌকায় করে সুতাং নদীর দুই পাশে গ্রামের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে শংকরপাশা ঘাটে পৌঁছা যাবে। তবে বর্ষাকালেই সুতাং নদীতে সচরাচর নৌকা পাওয়া যায়।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত