শিশুদের জন্য হামের টিকার ব্যবস্থা না করে বিগত দুই সরকার ‘ক্ষমাহীন অপরাধ’ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভবিষ্যতে এ ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য সরকার দ্রুততার সঙ্গে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে এবং তাতে সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি কিছুটা রোধ করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক সম্মেলনে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আয়োজনে উপজেলা স্বাস্থ্য ও উপজেলা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
তারেক রহমান বলেন, ‘সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত ইমিডিয়েট দুটি সরকারের জীবনবিনাশী ব্যর্থতা মনে হয় ক্ষমাহীন অপরাধ। ভবিষ্যতে আর কখনোই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আপনাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে এটিকে আমরা রোধ করে নিয়ে আসতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ।’ হামের সংক্রমণ থেকে শিশুদের তাৎক্ষণিক রক্ষায় নিয়োজিত সব চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যারা তাদের প্রিয় সন্তানদের হারিয়েছেন, সেসব পিতা-মাতা এবং স্বজনদের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
ভবিষ্যতের স্বার্থে যেকোনো মূল্যে মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পরিপূর্ণ মাতৃকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করার তাগিদ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তার কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালু করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। এতে যেকোনো নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যেকোনো হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন বলে জানান তারেক রহমান।
দেশের সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে চিকিৎসকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সব চিকিৎসকের কাছে আমি সহযোগিতা চাচ্ছি, যাতে যেকোনো মানুষ মিনিমাম হলেও চিকিৎসাসেবা পান। মানুষকে সহায়তা করুন, মানুষকে হেল্প করুন। কারণ সে আপনারই কেউ না কেউ, সে আপনারই একজন, সে আপনার এই সমাজের একজন সদস্য, সে আপনার এই দেশের একজন নাগরিক।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই ঘরে (ওসমানি মিলনায়তনে) যে কজন মানুষ আমরা উপস্থিত আছি, আমরা কোনো না কোনোভাবে প্রিভিলেজড। কেউ কম কেউ বেশি। কেউ না বলতে পারবেন না কিন্তু। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ, অধিকাংশ নাগরিক কিন্তু নট প্রিভিলেজড। আসুন, যারা নট প্রিভিলেজড আমরা অল্পসংখ্যক মানুষ যারা প্রিভিলেজড আছি, চেষ্টা করি নট প্রিভিলেজদের কিছুটা সহযোগিতা করতে, কিছুটা সাহায্য করতে কিছুটা তাদের কষ্ট লাঘব করতে। আমি বিশ্বাস করি, যে কথাগুলো, যে অনুরোধগুলো আপনাদের সামনে আমি করেছি, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হব।’
প্রধানমন্ত্রী মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি দ্রুত সমাধান এবং তাদের গাড়ি ও চালক নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিএনপি সরকারের বিস্তারিত পরিকল্পনা রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু করার পরিকল্পনা বা চিন্তাভাবনাও করছে। যাতে করে নাগরিক চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে আরও উন্নত করা। প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজ ও কার্যকর করা। ‘নাগরিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন নিরাপত্তা মর্যাদা এবং জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সম্পর্কেও সরকার অবশ্যই ওয়াকিবহাল। এ ব্যাপারে সরকার সাধ্যমতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বদ্ধপরিকর।’
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমি একটি কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজ নিজ এলাকায় একটি কার্যকর জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবেন। নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা বিএনপির স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সংক্ষিপ্ত একটি ঘটনা বলব এই ঘটনাটি হচ্ছে, একটি নামের সঙ্গে বোধহয় আপনাদের বেশ কিছু মানুষ পরিচিত আছেন। ফাতেমা নামে একটি নাম। এই মেয়েটি আমার আম্মার সঙ্গে জেলেও ছিলেন, যেহেতু আম্মা অসুস্থ ছিলেন। ও অনেক দিন অনেক বছর ধরে আছে। আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গেছে সে। দুদিন আগে তার এক আত্মীয়, ওর বাড়ি বরিশালের দিকে, তার প্রসূতি কমপ্লিকেসি দেখা দেয়। তাকে বরিশাল হাসপাতালে নেওয়া হলো... বরিশাল হাসপাতালে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা বলল বিভিন্ন রকম কমপ্লিকেসি। ‘তাকে সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় রেফার করা হচ্ছে। আমি বাসায় যাওয়ার পর আমার স্ত্রীর কাছে শুনলাম যে সামান্য বেসিক জিনিসটা ওখানে দেওয়া সম্ভব হয়নি বা দিচ্ছে না। ঢাকায় সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু ফাতেমা স্বাভাবিকভাবে আমার ওয়াইফকে বলেছে উনিও দুই-একজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। সে জন্য ফাতেমার সেই আত্মীয় খুব স্বাভাবিকভাবে বেটার চিকিৎসা পেয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্নটি যেটি, সেটি হচ্ছে সবাই তো ফাতেমা না বা সবাই ফাতেমার আত্মীয় না। যেহেতু আমার স্ত্রী ঘটনাটি জানতে পেরেছে, স্বাভাবিকভাবে উনি টেককেয়ার করেছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেই কথাটা আমি বলতে চাইছি, ওখানে যারা দায়িত্বরত ছিলেন, তারা যদি আরেকটু যত্নশীল হতেন, তারা যদি আরেকটু কেয়ারফুল হতেন, তাহলে হয়তো অনেকগুলো সমস্যাকে এড়ানো যেত। সব না হলেও অনেকগুলো সমস্যাকে এড়ানো যেত।’
উপজেলাপর্যায়ের ছয়জন চিকিৎসক শোভন কুমার বসাক, মনজুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, মজিবুর রহমান, সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, সুমন কান্তি সাহা এবং তাসনিম জুবায়েরকে কর্মদক্ষতার জন্য তাদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এমএ মুহিত, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন বক্তব্য রাখেন।
সিয়ামের পরিবারের পাশে প্রধানমন্ত্রী : সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ‘হামে আক্রান্ত এক সন্তানের মৃত্যু, অন্য সন্তানকে নিয়েও আতঙ্কিত মা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন বিএনপির চেয়ারম্যান ও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টিগোচর হয়। তাৎক্ষণিক প্রধানমন্ত্রী তার অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে দ্রুত ওই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিনিধিদল পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্য সচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল কামরাঙ্গীরচর এলাকায় শোকাহত শামীম-নাহার দম্পতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পৌঁছে দেন এবং অসুস্থ অন্য সন্তানের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্য মাসুদ রানা লিটন, মোস্তাকিম বিল্লাহ, শাকিল আহমদ, বুয়েট ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবু হানিফ, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ইমতিয়াজ সেতু, ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতা আব্দুল্লাহ আল মিসবাহ প্রমুখ।
শামীম-নাহার দম্পতির বড় সন্তান নিহাল (৬) এবং ছোট সন্তান সিয়াম (৩) হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ছোট সন্তান সিয়াম (৩) মারা যায়, যা পরিবারটির জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
