৪৮০ দিনের আন্দোলনে বাতিল প্রকল্প আবারও শুরু!

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৭ এএম

৪৮০ দিনের আন্দোলনে বাতিল হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের প্রকল্প আবারও শুরু করতে চায় বিএনপি। আর এই প্রকল্পটি হলো চট্টগ্রামের ফুসফুসখ্যাত সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভিত্তিতে (পিপিপি) এই প্রকল্পটি নির্মাণের জন্য আজ সরেজমিন পরিদর্শনে আসছেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে ফুসছে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ এবং তা প্রতিহতের ঘোষণাও দিয়েছে চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।

সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিরুদ্ধে আমি নিজেও আন্দোলন করেছি উল্লেখ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিআরবি চট্টগ্রামের মানুষের শ্বাস নেওয়ার জায়গা। এই স্থানে কোনোভাবেই হাসপাতাল নির্মাণ করার সুযোগ নেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এখানে হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিবাদে এই স্থানে গাছ রোপণ কর্মসূচি পালন করেছিলাম। আমি আশা করব, সরকার পরিবেশ ধ্বংসের কোনো কাজ করবে না।

নগরপিতা ডা. শাহাদাত হোসেনের মতো চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিমও এই কর্মযজ্ঞের বিরোধী। তিনি বলেন, ‘বিগত মাস্টারপ্ল্যানে সিআরবিকে গ্রিন জোন হিসেবে মার্কিং করে রাখা হয়েছে এবং তা মেইনটেইন করা হয়েছে। যদিও এই জায়গাটির মালিক রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, তারপরও এখানে কোনো প্রকল্প নিতে হলে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সিডিএ থেকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র নেওয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর বিধি অনুযায়ী এখানে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই।’

নগরপিতা ও নগরীর উন্নয়নের অনুমোদনকারী দুই প্রধান ব্যক্তি যখন সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের বিরোধী অবস্থানে, তখন পরিবেশগত অবস্থা জানতে কথা হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘একটি নগরের জন্য ২৫ শতাংশ জায়গা উন্মুক্ত থাকা দরকার। নগরের তাপমাত্রা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভূ-গর্ভস্থ পানি রিচার্জসহ পরিবেশের সব উপাদানের জন্য উন্মুক্ত স্থান রাখা দরকার। আর সিআরবি চট্টগ্রাম মহানগরীকে জীবন্ত রাখতে যে অবস্থায় রয়েছে সেই অবস্থায় রাখা প্রয়োজন।

সিআরবির একেকটি শতবর্ষী গাছ একেকটি পৃথক ইকোসিস্টেম : সিআরবিতে ১৯৭ এর বেশি প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক। সিআরবি রক্ষা নিয়ে ২০২০ সালে যখন আন্দোলন শুরু হয়, সেই বছরের শেষের দিকে তিনি তার টিম নিয়ে পুরো সিআরবি এলাকা সার্ভে করেন। তখনকার সার্ভে সম্পর্কে জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘সিআরবিতে যেসব শতবর্ষী গাছ রয়েছে সেগুলো একেকটি শতাধিক পরজীবী এবং এদের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও শতাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীকে নিয়ে পৃথক ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। আর এই ইকোসিস্টেম শুধু মাটির ওপরে নয়, মাটির অভ্যন্তরেও তৈরি রয়েছে পৃথক জগত। এ ছাড়া পুরো এলাকায় ১৯৭ প্রজাতির বৃক্ষের পাশাপাশি ১৫৪টি ঔষধি প্রজাতির গাছ এবং দুর্লভ ৯ প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে।’

সিডিএর মাস্টারপ্ল্যানে কী আছে? : ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান এবং ২০০৮ সালের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপে) কদমতলী মোড়, টাইগারপাস মোড়, আমবাগান একে খান প্রধান অফিস, বাঘগোনা, লালখান বাজার মোড়, জমিয়তুল ফালাহ, আলমাস, কাজীর দেউরি, নেভাল ও গোয়ালপাড়া হয়ে কদমতলী মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকাটি কালাচারাল অ্যান্ড হেরিটেজ জোন হিসেবে মার্ক করা। এই এলাকায় কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন নেই। প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি হিসেবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এ পর্যন্ত এই এলাকাটি রক্ষা করে আসছে উল্লেখ করে সিডিএর সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা এই এলাকায় কোনো স্থাপনার অনুমোদন দিইনি। সার্কিট হাউজ নির্মাণ করার সময় আমরা গণপূর্ত অধিদপ্তরকে তা না করার জন্য চিঠি দিয়েছিলাম, একই সঙ্গে পুরো এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনার কোনো অনুমোদন এখনো পর্যন্ত সিডিএ দেয়নি। এলাকাটি সংরক্ষণ করা হয়েছে।’

সিআরবি ছাড়া নগরীর অন্যত্র হতে পারে হাসপাতাল : রেলওয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পেছনের দিক এবং পুলিশ সুপারের বাংলোর মধ্যবর্তী ছয় একর জায়গায় ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি গড়ে তোলা হলে কোনো গাছ কাটা পড়বে না। একই সঙ্গে এলাকার সবুজেরও কোনো সমস্যা হবে না। তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও সিডিএর ড্যাপ প্রণয়নকারী স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, ‘ছয় একর জায়গায় ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল এবং ১০০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা বিশাল ব্যাপার। তখন বাস্তবিক অর্থে এর পরিধি প্রায় দুই কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে হবে। এই এলাকায় আরও অনেক স্থাপনা গড়ে উঠবে এবং বাড়বে ট্রাফিক। এতে পুরো এলাকার জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হবে।’

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে বিদ্যমান হাসপাতালটিকে আরও আধুনিকায়ন করা যায় কিন্তু কোনোভাবেই নতুনভাবে পিপিপি পদ্ধতিতে হাসপাতাল নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন করে হাসপাতাল নির্মাণ করতে হলে প্রয়োজনে শহরের পতেঙ্গা, হালিশহর, পাহাড়তলী, সীতাকুন্ড বা অন্য কোনো এলাকায় করা যেতে পারে।

একই মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান বক্ষব্যাধি হাসপাতালটিকে আরও উন্নত করা যায় কিন্তু কোনোভাবেই নতুন কোনো প্রকল্প এই এলাকায় নেওয়া যাবে না।

৪৮০ দিনের আন্দোলনে বাতিল হয়েছিল প্রকল্প : একটি প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ৪৮০ দিন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া একটি রেকর্ড। ২০২১ সালের জুলাই মাসে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে শুরু হয়েছিল প্রতিবাদ আন্দোলন। আওয়ামী লীগের সেই প্রকল্পের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ টানা ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্পটি বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার এই প্রকল্পের উদয় হলো কীভাবে? এ বিষয়ে স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, গণআন্দোলনের মুখে যেখানে প্রকল্প বাতিল হয় সেখানে একই প্রকল্প একই স্থানে আবারও শুরু করার সাহস কোথা থেকে আসে?

রেলওয়ের বক্তব্য : পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ইউনাইটেড হাসপাতালর কর্তৃপক্ষের চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি এখনো বলবৎ রয়েছে বলে রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এ বিষয়ে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সংবাদকর্মীদের জানান, সেটি ৫০ বছরের চুক্তি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল এবং ১০০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ করার কথা ছিল। তখন জমি হস্তান্তরের সময় পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের কারণে হয়নি।

এদিকে রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গতকাল শনিবার চট্টগ্রামে এসেছেন। মন্ত্রীর শিডিউল তালিকায় সিআরবিতে রেলওয়ের হাসপাতাল নির্মাণের স্থান পরিদর্শনের কথা উল্লেখ রয়েছে।

অপরদিকে রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম হাসপাতাল এলাকা পরিদর্শনে ঘোষণা দেওয়ায় চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে। এর প্রতিবাদে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশিষ্ট নাগরিকরা এর বিরোধিতা করেছেন। পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েস সভাপতি শরীফ চৌহান ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রে প্রাণ-প্রকৃতির আধার এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত সিআরবিতে পরিবেশবিরোধী কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চট্টগ্রামবাসী মেনে নেবে না। অতীতের সরকারও এরকম উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। চট্টগ্রামের ফুসফুসখ্যাত সিআরবি এলাকাতে আবার হাসপাতাল নির্মাণের চেষ্টা করা হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত