দুদক সেই পাঁচ আমলার আমলনামার সন্ধানে 

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৬ এএম

আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান কুড়িগ্রাম জেলার প্রশাসক ছিলেন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তাকে ঢাকায় বদলি করে আনা হয়। ওই সময় তিনি শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। হয়ে ওঠেন সরকারের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা। পরে তিনি পরিকল্পনা কমিশনে অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শুধু তিনিই নন, তার সঙ্গে রয়েছেন আরও চার অতিরিক্ত সচিব (যারা আগে জেলা প্রশাসক ছিলেন) ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, রাব্বী মিয়া, তন্ময় দাস ও শওকত আলী। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। সংস্থাটির উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বাধীন একটি দল তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করছেন।

জানা গেছে, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ২০১৮ সালে দিনের ভোট আগের রাতে করা, ব্যালট জালিয়াতি, অনেক কেন্দ্রে অবিশ্বাস্যভাবে ৯০ শতাংশের বেশি কাস্টিং দেখানো, ব্যাপক আর্থিক লেনদেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রার্থীকে বিজয়ী করার মূল কারিগর ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা। তাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসাররা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক কাজটি সম্পাদন করেন। ওই নির্বাচন ঘিরে ঘুষ লেনদেন, অনিয়ম-দুর্নীতি, জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। এরপরই দুদক ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের তালিক চেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারীদের তালিকা দুদকে পাঠানো হয়। তালিকা ধরে অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তাদের মধ্যে এক নথিতে সাবেক পাঁচজন অতিরিক্ত সচিবের (যারা ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় জেলা প্রশাসক ছিলেন) বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তারা হলেন কুড়িগ্রাম ও ঢাকার ডিসি আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান, নরসিংদী ও ময়মনসিংহের ডিসি ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ^াস, রাজবাড়ীর ডিসি শওকত আলী, নারায়ণগঞ্জের ডিসি রাব্বী মিয়া ও নোয়াখালীর ডিসি তন্ময় দাস। এর মধ্যে ফেরদৌস খানের রেকর্ডপত্র দুদকের হাতে এসে পৌঁছেছে। যাদের রেকর্ডপত্র আসেনি, তাদের রেকর্ডপত্রে সন্ধান চলছে।

সাবেক ডিসি ও অতিরিক্ত সচিব ফেরদৌস খানের রেকর্ডপত্রের তথ্যানুযায়ী, তার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার কাটাছড়া গ্রামে। তিনি ১৮তম বিএসএস প্রশাসন ক্যাডারে চাকরিতে যোগদান করেন। তার বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে ২০২৫ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার।

তথ্যমতে, ফেরদৌস খানের তার ১৮তম অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে মুন্সীগঞ্জে যৌথভাবে ক্রয়কৃত জমিতে ৫০ হাজার টাকার শেয়ার রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার খিলক্ষেতের পাতিরা জমি ক্রয়ে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার শেয়ার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে স্ত্রীর আট ভরি স্বর্ণ বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকায় চট্টগ্রামের সীতাকু-ে ৫.১৬ শতাংশ জমি ক্রয়, ২০২৩ সালে ঢাকার মিরপুর স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্পে ১৫৪৫ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ৪১ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৯ টাকায় এবং খিলক্ষেত বিএসএস প্রশাসন কল্যাণ সমিতির আবাসন প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। সব মিলিয়ে তার ৬৯ লাখ ৮৯ হাজার ৬১৯ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।  এ ছাড়া তার যেসব অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তার হিসাব বলছে, তার জিপি ফান্ডের পরিমাণ ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৫ টাকা, প্রাইজবন্ডের মূল্য ৩০ হাজার টাকা, আট ভরি স্বর্ণের মূল্য ২ লাখ ৪২ হাজার টাকা, আসবাবপত্র ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কম্পিউটার-সামগ্রী ২৫ হাজার, সঞ্চয়পত্র ২২ লাখ টাকা, হাতে নগদ ২০ হাজার ৪৫১ টাকা, সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখার দুটি হিসাবে জমা ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৬৭৬ টাকা ও ব্র্যাক ব্যাংকে জমা ৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩০০ টাকা। ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটি গাড়ির মূল্য ৩০ লাখ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৬২২ টাকা। তবে তিনি ২০১৩ সালের ১০ জুলাই ব্র্যাক ব্যাংকে ১৮ লাখ টাকার এফডিআর করেছেন, সেটির তথ্য আয়কর নথিতে উল্লেখ না করে গোপন রেখেছেন। নথিপত্রে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৪০ হাজার ২৪১ টাকা। গোপন করা টাকা ধরা হলে সম্পদের পরিমাণ হবে ২ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার ২৪১ টাকা। বাস্তবে তার সম্পদের পরিমাণ কত? সেটির খোঁজ করছে দুদক।

তন্ময় দাস : তার বাড়ি শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার শ্রীবরদী গ্রামে। তিনি নোয়াখালীর ডিসি থাকাকালে ২০১৮ জাতীয় নির্বাচনের ইঞ্জিনিয়ারিং করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী করার সুযোগ করে দেন। পরে তিনি পদোন্নতি পেয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ শাখার মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পান। এ পদে থাকাকালে তিনিসহ অন্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পে ১০ কাঠা করে ছয়টি (মোট ৬০ কাঠা) প্লট বরাদ্দ দেন। ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক। অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ১২, ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়। প্রতিটি মামলায় শেখ হাসিনা ও অন্যদের সঙ্গে তন্ময় দাসকে আসামি করা হয়। মামলার তদন্তে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। আদালত ওই মামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামির সঙ্গে তন্ময় দাসকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ও জরিমানা করেন।    

ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস : তিনি ১৯৯৮ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি চাকরিতে যোগদান করেন। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার ঠাকুর মালিথিয়ায়। তিনি নরসিংদী ও ময়মনসিংহ জেলার ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ডিসি থাকাকালে ইঞ্জিনিয়ারিং করে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী করেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ডিসি থাকাকালে ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের ৩০ বছরের কম দেখিয়ে নিয়োগ দেন। তার বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে ২০২৫ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার।

রাব্বী মিয়া : তিনি ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার রাধানগরে জম্মগ্রহণ করেন। ১৭তম বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ছিলেন। তিনি ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকালে ইঞ্জিনিয়ারিং করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জয়ী করেন। পরে তিনি অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পান। তার বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে ২০২৫ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার।

মো. শওকত আলী : তিনি ১৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি ২০১৭ সালের ১১ মে থেকে ২০১৯ সালের ২৪ শে জুন পর্যন্ত রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন।  তিনি ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে রাজবাড়ীর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকালে ইঞ্জিনিয়ারিং করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী করেন। পরে তিনি অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তার বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণে ২০২৫ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার।

জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ডিসিসহ অন্যদের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাকে পুরো তালিকা দেয়। ওই তালিকা তদন্ত করে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের কম হবে তাদের ওএসডি এবং যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের বেশি তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিতর্কিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ২২ জন সাবেক জেলা প্রশাসককে (ডিসি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে দুজন সচিব, ১৮ জন অতিরিক্ত সচিব, একজন যুগ্মসচিব এবং একজন উপসচিব ছিলেন। তারা সবাই ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন।

গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারা অবসরে চলে গেছেন, কিন্তু সার্ভিসে থাকা অবস্থায় যারা কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন তাদের বিষয়ে আমরা দুদকে মামলা দিচ্ছি। অবসরে যাওয়া মানেই যে মুক্তি পেয়ে যাবেন, তা কিন্তু নয়। যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা অবসরে যাওয়ার পরও তাদের ফলোআপ করা হচ্ছে এবং হবে। জনস্বার্থে সরকার এখানে কাউকে ছাড় দেবে না। তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকবে, তাদের পুরো ‘কেস টু কেস’ দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এবং দুদকে চিঠিপত্র চলে গেছে। দুদক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত