মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ৫০তম দিন গেছে গতকাল শনিবার। এ যুদ্ধ সহসা শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইসরায়েল ও লেবানন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার সূত্রে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খোলার যে ঘোষণা এসেছিল, তাও কার্যকর হয়নি।
যুদ্ধরত দেশগুলো থেকে পরস্পরবিরোধী তথ্য আসার কারণে এ প্রণালি খোলার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাও রয়েই যাচ্ছে, এমনটি বলছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক পরিবহন বিশেষজ্ঞ জন-পল রোদ্রিগ বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ঘোষণা করলেও পরস্পরবিরোধী নির্দেশনা ও তথ্য এখনো অনেক জাহাজকে এই জলপথ ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখছে। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে
গতকাল তিনি বলেন, সব পক্ষ থেকেই পরস্পরবিরোধী তথ্য দেওয়া হচ্ছে। প্রণালিটি উন্মুক্ত এমন ঘোষণার পর থেকেই জাহাজগুলো চলাচলের চেষ্টা করছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক জাহাজই ফিরে যাচ্ছে, কারণ পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত এমন ঘোষণা দেওয়ার একদিন পর ইরান গতকাল আবার সেখানে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখায় দেশটি এ প্রণালিতে আবার নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা দেয়।
ইরানের নৌবাহিনী এক রেডিও বার্তায় বলেছে, দেশটির অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে এ প্রণালি অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না। জাহাজ চলাচল কেবল ইরান কর্তৃক নির্ধারিত নিরাপদ লেন বা পথগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কোনো সামরিক জাহাজকে এই প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।
গতকাল এই প্রণালি অতিক্রম করার সময় অন্তত দুটি ভারতীয় তেলবাহী জাহাজে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
ইরানের একজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, প্রণালিটি আবার খোলার শর্ত হিসেবে ইরানের আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রণালিটি খুলতে ইরানের ঘোষণা আসার পর যুক্তরাষ্ট্র অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে অস্বীকৃতি জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে ইরানের অর্জিত প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন দেশে আটকে আছে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আগামী বুধবারের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো নাও হতে পারে। তবে ইরান গতকাল পর্যন্ত পরবর্তী দফার আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘নৌ-অবরোধ’ জারি রাখার ঘোষণা দেওয়ায় এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিনিময় হওয়া বার্তায় আমেরিকা ‘অতিরিক্ত দাবি’ করার কারণে তেহরান পরবর্তী দফার আলোচনায় সায় দেয়নি।
ইরান বলছে, আলোচনা অব্যাহত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘অতিরিক্ত দাবি’ বর্জন করা একটি অপরিহার্য শর্ত। অন্যথায়, ইরান দীর্ঘমেয়াদি এবং নিষ্ফল আলোচনায় সময় নষ্ট করতে ইচ্ছুক নয়। তেহরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনার বিষয়ে দেশটির এই অবস্থান পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
এর বাইরে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর না বাড়ানোরও ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। দেশটির একজন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তেহরান এখন কোনো সাময়িক সমাধান নয়, বরং সব অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে একটি ‘সামগ্রিক প্যাকেজ’ বা পূর্ণাঙ্গ চুক্তির জন্য আলোচনায় আগ্রহী।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সব আলোচনা মূলত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের কোনো পারমাণবিক সমরাস্ত্র নির্মাণের সক্ষমতা থাকবে না। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্নরকম। ইরান এবার আলোচনায় এনেছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক অধিকার, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, বিদেশে জব্দকৃত অর্থ ফেরত, ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি, যুদ্ধের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের আঞ্চলিক সম্পর্ক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার দাবি করেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু তার এই দাবিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে ইরান।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাইয়ের দাবি, ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের কোনো প্রতিশ্রুতি কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা বা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের কোনো প্রস্তাবই ইরান মেনে নেবে না। এটিকে তেহরানের জন্য একটি ‘কৌশলগত রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘কুফরি ও অহঙ্কারী শক্তির অগ্রপথিক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ লড়াই চলবেই। ইরানের ‘সেনা দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি এ কথা বলেন।
ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ঘোষিত ‘নৌ-অবরোধ’ কঠোরভাবে কার্যকর রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সেন্টকম জানায়, অবরোধের সময় পরিচালিত অভিযানে এ পর্যন্ত ২৩টি জাহাজ নির্দেশ মেনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট মেরিনট্রাফিক জানিয়েছে, মাল্টার পতাকাবাহী একটি প্রমোদতরী (ক্রুজ শিপ) ‘সেলেস্টিয়াল ডিসকভারি’ গতকাল হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই প্রথম যাত্রীবাহী জাহাজ, যা এই পথ দিয়ে চলাচল করল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজটিতে কোনো যাত্রী ছিল না। জাহাজটি ৪৭ দিন ধরে দুবাই বন্দরে নোঙর করা ছিল।