আল্লাহর দেওয়া সেরা নেয়ামত মেধা

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৮ এএম

মেধা মহান আল্লাহর দেওয়া সেরা নেয়ামত। এই নেয়ামতের যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে হলে একে আল্লাহর পথে এবং মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। মেধাকে আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা কেবল মেধাবীই নয়, বরং নৈতিকভাবেও শক্তিশালী হয়। মেধার এই আলো যেন কেবল পার্থিব উন্নতির পেছনে না ছুটে পরকালীন নাজাতের উসিলা হয়।

পবিত্র কোরআনের সুরা আর-রহমানের শুরুতে মহান আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দান করার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন। এই প্রতিভা ও মেধা হলো স্রষ্টার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক অপূর্ব নেয়ামত, যা মানুষকে পশুপাখি থেকে আলাদা করেছে। চিন্তাশীল মানুষের জন্য এই মহাবিশ্বের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে স্রষ্টার নিদর্শন। আল্লাহ প্রদত্ত এই মেধা ও মননকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোই হলো একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব।

মেধা ও প্রতিভা বিরাট এক শক্তি। সব মানুষের মধ্যে মেধা ও প্রতিভার উপস্থিতি রয়েছে। তবে কেউ এটা কাজে লাগাতে পারে, আবার কেউ অযতেœ-অবহেলায় তা নষ্ট করে দেয়। মহান আল্লাহ মানুষের মধ্যে এই অমূল্য সম্পদ নিহিত রেখেছেন এটা কাজে লাগিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে চেনার জন্য। সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করার জন্য।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ জ্ঞানীদের দুনিয়ার গতিবিধি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলেছেন। আর এর জন্য মেধা ও প্রতিভার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসুলরা মহান আল্লাহ প্রদত্ত মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়েই যুগের সেরা মানুষ হয়েছেন।

প্রতিভা মহান আল্লাহর একটি বিশেষ ও অপূর্ব নেয়ামত। মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগানোই হচ্ছে এর সার্থকতা। মহান আল্লাহর সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য উদঘাটন করা, তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া জ্ঞানীদেরই কাজ। জ্ঞানীরা যদি তাদের অমূল্য সম্পদ মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারেন, তবে তারাই সফল।

পক্ষান্তরে জ্ঞানীরা যদি এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হন, তবে এর মাশুলও তাদেরই গুনতে হবে। একজন গণ্ডমূর্খ ও নির্বোধ লোক মহান আল্লাহর পরিচয় লাভে ব্যর্থ হলে সে যতটুকু দায়ী হবেন তার চেয়ে বেশি দায়ী হবেন একজন মেধাবী ও প্রতিভাধর ব্যক্তি।

মেধা ও প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন না হলে মহান আল্লাহ তা ছিনিয়ে নেন। এর দ্বারা অসদাচরণ করলে মেধা ও প্রতিভার অবক্ষয় হয়। মেধা ও প্রতিভা সব মানুষের মধ্যেই কম-বেশি আছে। এটা স্রষ্টার প্রকৃতিগত দান, কারও অর্জিত নয়। এ জন্য সবার উচিত মেধা ও প্রতিভাকে প্রকৃত অর্থে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কল্যাণ ও সাফল্য অর্জন করা।

মানবতার কল্যাণে, সৃষ্টির উন্নয়নে কিছু করতে পারাই প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন। অমূল্য এই সম্পদটুকু যেন সৃষ্টি ও মানবতার বিরুদ্ধে ব্যয় না হয়, সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ভালো কিছু না পারলেও অন্তত মন্দ কিছু যেন মস্তিষ্ক থেকে বের না হয়, সে প্রতিজ্ঞা করতে হবে সবাইকে। মেধার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে।

মেধার অপব্যবহার যেমন ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ ধ্বংস, তেমনি এর সঠিক ব্যবহার পৃথিবীকে করে তুলতে পারে শান্তিময় ও সুন্দর। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেয়ামতের দিন এই নেয়ামতের হিসাব দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন জ্ঞান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন, যা কোনো উপকারে আসে না। (সহিহ মুসলিম)

মেধার আমানত রক্ষা করা এবং একে সঠিক পথে পরিচালিত করার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম কেবল ইবাদত-বন্দেগির ধর্ম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা মানুষকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের তাগিদ দেয়। পবিত্র কোরআনের অসংখ্য স্থানে মহান আল্লাহ মানুষকে চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছেন। সুরা বাকারার ২৬৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা বিশেষ জ্ঞান দান করেন এবং যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাকে মূলত প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়েছে।

এই প্রভূত কল্যাণ হলো সেই মেধা, যা মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখায়। মেধাবী মানুষ যখন তার চিন্তাশক্তি দিয়ে আল্লাহর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে গবেষণা করে, তখন তার ইমান আরও সুদৃঢ় হয়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে মেধার ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেশি বহুমুখী হয়ে উঠেছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে মেধার উৎকর্ষ তখনই সার্থক হয় যখন তা আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সমন্বিত হয়।

একজন মুসলিমের মেধাবৃত্তিক চর্চা হবে জনকল্যাণমুখী। মেধা ও প্রতিভাকে যখন কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে বা জাগতিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা আর নেয়ামত থাকে না, বরং অভিশাপে পরিণত হয়।

বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখি, কত মেধাবী মানুষ তাদের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র তৈরি করছে কিংবা সাইবার অপরাধের মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করছে। এই ধরনের মেধা চর্চাকে ইসলাম সমর্থন করে না। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, যার মেধা যত বেশি তার ওপর সামাজিক দায়িত্ব তত বেশি। জ্ঞানীদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আলেমের মর্যাদা জাহেলের ওপর তেমন, যেমন পূর্ণিমার চাঁদের মর্যাদা সব তারকার ওপর। (আবু দাউদ) এখানে আলেম বা জ্ঞানী বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি তার মেধা ও জ্ঞানকে স্রষ্টার সন্তুষ্টি ও মানবতার সেবায় নিয়োজিত করেছেন।

মেধা বিকাশের জন্য জ্ঞানচর্চা বা ইলম অর্জন অপরিহার্য। তবে সেই ইলম হতে হবে উপকারী। মেধা হলো একটি স্বচ্ছ আয়নার মতো, যাতে সঠিক জ্ঞানের আলো পড়লে মানুষ তার আসল গন্তব্য খুঁজে পায়। কিন্তু গুনাহ এবং অবাধ্যতা এই আয়নায় মরিচা ফেলে দেয়। ফলে মানুষের বুদ্ধি ও মেধা সঠিক পথে কাজ করতে পারে না। তাই মেধার সুস্থতা বজায় রাখার জন্য আত্মশুদ্ধিও প্রয়োজন।

মেধা ও প্রতিভাকে সঠিক পথে পরিচালনার বড় শর্ত হলো বিনয়। একজন মেধাবী মানুষ যদি অহংকারী হয়ে ওঠেন, তবে তার প্রতিভা তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ইবলিস ছিল অত্যন্ত জ্ঞানী ও মেধাবী, কিন্তু অহংকারের কারণে সে অভিশপ্ত হয়েছে। তাই প্রতিভাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত মনে করে সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

পরকালের কঠিন বিচার দিবসে মানুষকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, যার অন্যতম হলো সে তার অর্জিত জ্ঞান বা মেধাকে কোন পথে ব্যয় করেছে। সুনানে তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে, পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোনো আদম সন্তান কেয়ামতের দিন এক কদমও নড়তে পারবে না। তার মধ্যে একটি হলো, সে তার জ্ঞান অনুযায়ী আমল করেছে কি না। এই হাদিসটি প্রতিটি মেধাবী ও শিক্ষিত মানুষের জন্য এক বিশাল সতর্কবার্তা। মেধা ও প্রতিভা কেবল সার্টিফিকেটের পাতায় কিংবা সামাজিক মর্যাদার আসনে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়। এর প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে যখন একজন মেধাবী ব্যক্তি তার এলাকার নিরক্ষরতা দূর করতে এগিয়ে আসবেন, যখন একজন মেধাবী চিকিৎসক গরিব মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেবেন, কিংবা যখন একজন মেধাবী প্রযুক্তিবিদ ইসলামের প্রচার ও প্রসারে নতুন নতুন মাধ্যম আবিষ্কার করবেন।

আমাদের যুবসমাজ আজ মেধার অপচয় করছে ক্ষতিকর বিনোদন ও অর্থহীন কাজে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার অনেক প্রতিভাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছে। অথচ এ সময়ে মেধা ও প্রতিভাকে যদি সৃজনশীল কাজে লাগানো হতো, তবে দেশ ও জাতি অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারত। প্রতিভাকে শানিত করার জন্য প্রয়োজন সাধনা ও ধৈর্য। ইসলামে অলসতার কোনো স্থান নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অলসতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।

মেধার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই পৃথিবীতে ইনসাফ কায়েম করা সম্ভব। একজন মেধাবী শাসক যখন তার প্রজ্ঞা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তখন প্রজারা শান্তিতে থাকে। একজন মেধাবী বিচারক যখন তার তীক্ষè বুদ্ধি দিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেন, তখন সমাজ থেকে অপরাধ দূর হয়।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত