জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা মৃত্যু

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

আমাদের সবাইকে মৃত্যুবরণ করেতে হবে। এটা অনিবার্য বাস্তবতা। মৃত্যু কারও প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা করে না। এই অনিবার্য মুহূর্তকে পবিত্র কোরআন আমাদের সামনে এক গভীর ও সচেতনতার ভাষায় তুলে ধরে। ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা, যে তোমাদের জন্য নিয়োজিত রয়েছে। তারপর তোমাদেরকে রবের নিকট তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে।’ (সুরা সাজদাহ ১১)

এই আয়াতটি মানবজীবনের সেই অন্তিম দৃশ্যকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলে, যখন মৃত্যুর ফেরেশতা এসে দাঁড়ায়, তখন কোনো বিলম্ব, কোনো অজুহাত, কোনো পালানোর পথ থাকে না। ‘নিয়োজিত’ শব্দটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মৃত্যু কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি আল্লাহর নির্ধারিত সুনিপুণ পরিকল্পনার অংশ। প্রতিটি প্রাণের জন্য নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট মুহূর্ত রয়েছে, যা এক সেকেন্ডও এদিক-সেদিক হয় না। এই সত্যকে আরও জোরালো করে কোরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৮৫)

মানুষ সাধারণত মৃত্যুকে দূরের একটি ঘটনা মনে করে, যেন এটি অন্য কারও জন্য, অন্য সময়ের জন্য। কিন্তু কোরআনের এই ঘোষণা সেই ভ্রান্তি ভেঙে দেয়। মৃত্যুর ফেরেশতা কোনো পার্থিব আভিজাত্য, বয়স কিংবা শক্তির পরোয়া করেন না। এই উপলব্ধি মানুষের হৃদয়ে বিনয় জাগায় এবং তার নশ্বর অস্তিত্বের অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, যদিও তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরেও অবস্থান করো।’ (সুরা নিসা ৭৮)

মৃত্যুর এই মুহূর্তটি শুধু একটি সমাপ্তি নয়, বরং এটি আখেরাতের পথে যাত্রার শুরু। পৃথিবীর সব মায়ার বাঁধন, সঞ্চিত ঐশ্বর্য ও লৌকিক পরিচয় যেখানে স্তব্ধ হয়ে যায়, সেখানে মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। সেই বিজন পথে তার একমাত্র সহযাত্রী হয় দুনিয়ার নেক আমল। তাই মুমিনের কাছে প্রতিটি দিন, প্রতিটি পলক হলো সেই মহান সাক্ষাতের নীরব প্রস্তুতি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন সে বলে, হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ (সুরা মুমিনুন ৯৯-১০০)

মৃত্যুর ফেরেশতার উপস্থিতির চিন্তা অন্তরে গভীর আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটিয়ে দেয়। এটি মানুষকে গাফিলতির ঘোর থেকে মুক্ত করে এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে শেখায়। যখন কেউ হৃদস্পন্দনের প্রতিটি তালে বিদায়ের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়, তখন তার কাছে জাগতিক হাহাকার ও প্রতিযোগিতা তুচ্ছ হয়ে যায়। তার একমাত্র আরাধ্য হয়ে ওঠে পরকালীন পাথেয় সংগ্রহ।

মৃত্যুর ফেরেশতার উপস্থিতি নিশ্চিত সত্য, এটি আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা এই পৃথিবীতে এক ক্ষণস্থায়ী মুসাফির। প্রজ্ঞাবান সেই ব্যক্তি, যিনি এই মহান সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করেন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সেই অনিবার্য সাক্ষাতের প্রস্তুতিতে পরিণত করেন।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত