উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, তীব্র দাবদাহ এবং সেচের পানির ঘাটতিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে ফসল উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষিসংশ্লিষ্টরা। কৃষি বিভাগ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং খাল-নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি দিনদিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও পানির অভাবে গত ১০ বছরে খুলনা অঞ্চলে অন্তত ১২১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৮৫০ মেট্রিক টন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ২ কোটি ৬১ লাখ ৪৯ হাজার ১০০ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫ হাজার ৭৭ জন কৃষক।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে গড়ে প্রতি আড়াই বছরে একবার বড় ধরনের খরার প্রভাব পড়ে। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মার্চের শুরু থেকেই দেশে তীব্র দাবদাহ শুরু হয়েছে, যা জুনের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময় মাঠে বোরো ও আউশ ধানের চাষাবাদ চলতে থাকে। বিশেষ করে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকলে ধানের পরাগায়ন ব্যাহত হয়, ফলে ধান চিটা হয়ে যায় এবং ফলন কমে যায়।
কৃষি বিভাগের মতে, এই সময়ে জমিতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে কৃষকরা প্রয়োজনীয় সেচ দিতে পারছেন না। ফলে বোরো ও আউশ ধান, পাট এবং শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা অঞ্চলে মোট ১ হাজার ১৮৭টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে ৬১৫টি ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে এবং আরও অনেক খাল ভরাট হওয়ার পথে। এতে কৃষিজমিতে পানির প্রবাহ কমে গেছে। যেসব খালে এখনো কিছুটা পানি রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগ স্ল্ইুসগেট অকেজো অথবা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সেচের জন্য এসব খাল ব্যবহার করা যাচ্ছে না, বরং লবণাক্ত পানি জমিতে উঠে ফসল নষ্ট করছে। বর্তমানে খুলনা অঞ্চলে ৬৪৯টি সøুইসগেট অচল অবস্থায় রয়েছে।২০২২ সালে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কম বৃষ্টিপাত ও লবণাক্ততার কারণে শুধু বাগেরহাট জেলাতেই ১০১ হেক্টর জমির বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছিল বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।
ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামের কৃষক সাদেক আলী বলেন, ‘জমিতে পানি দিতে পারছি না। পানির স্তর প্রায় ৪০ ফুট নিচে নেমে গেছে। টিউবওয়েল বা মেশিনে পানি উঠছে না। খাল-বিলে কোথাও পানি নেই। ধান শুকিয়ে যাচ্ছে, খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির ওপরে উঠলেই ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে তাপমাত্রা বেশি থাকলে ধান চিটা হয়ে যায়। বর্তমানে খুলনা অঞ্চলে তাপমাত্রা অনেক সময় ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি ওঠানামা করছে, যা কৃষির জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকরা প্রয়োজনীয় সেচ দিতে পারছেন না। পাশাপাশি লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণেও উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কৃষকদের এ সময় খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যায় ৭ থেকে ১০ দিন পর পর ফলদ গাছে সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষিজমিতেও পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখার জন্য বলা হয়েছে।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, খাল পুনঃখনন, সøুইসগেট মেরামত এবং পর্যাপ্ত সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে খুলনা অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। এতে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
