‘জীবন’ মানুষের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু আসলে কতটা মূল্য পায় সে সমাজ, রাষ্ট্রে? শ্রমিকের জন্য এই প্রশ্ন এক বেদনাময় উত্তর নিয়ে আসে। যতক্ষণ শ্রম দিতে পারে ততক্ষণ তার গুরুত্ব। আর সে কারণে, শ্রমকে সস্তা বানিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে শ্রমিক। এই কথাই প্রমাণ করে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পার হয়েছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কারখানা দুর্ঘটনা হিসেবে, রানা প্লাজা ভবন ধসকে বিবেচনা করা হলেও তা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে কতটুকু তা এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ। ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালের এই ভবন ধসের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১১৩৮ জন, যাদের মধ্যে ২৯১ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের সমাধিস্থ করা হয়েছে জুরাইনে অচিহ্নিত শ্রমিকদের কবরস্থানে। এই ভবন ধসের ঘটনায় আহত হয়েছিলেন ২৫০০ জন। এই ভয়াবহ কাঠামোগত হত্যার মাত্র ৫ মাস আগেই ২০১২ সালে তাজরিন অগ্নিকান্ডে জীবন হারিয়েছিলেন ১১২ জন। সেই দগদগে স্মৃতি মন থেকে মুছে যেতে না যেতেই, রানা প্লাজা ভবন ধস শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর সব দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। ১৩ বছর পর হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, রানা প্লাজার ধ্বংসলীলা আবেগকে নাড়া দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দায়িত্ব পালনে ততটা উদ্বুদ্ধ করেনি সংশ্লিষ্ট কাউকে। যে কারণে এরপর টাম্পাকো, হাসেম ফুডস, বিএম কনটেইনার ডিপো, বেইলি রোড, মিরপুর, কেরানীগঞ্জের গ্যাস লাইটার কারখানার মৃত্যু মনে করিয়ে দিয়েছে শ্রমিকের শ্রম যেমন সস্তা, তাদের জীবন তেমনি অবহেলার। শ্রমিক কাজ করতে আসে জীবনকে উন্নত করতে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং মৃত্যু যেন শ্রমিকদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বড় আকারের প্রতিষ্ঠান এবং বেশি পরিমাণ প্রাণহানি না ঘটলে তা সাড়া ফেলে না, শোরগোল তোলে না। আড়ালেই থেকে যায় দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর খবর। কর্মক্ষম মানুষকে হারিয়ে শ্রমজীবী পরিবারগুলো যে কী অসহায় হয়ে পড়ে তা নজরে আসে না অনেকক্ষেত্রেই।
রানা প্লাজাসহ বিভিন্ন কারখানায় যেসব মৃত্যু এবং মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার পর বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি কর্র্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত হয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন কখনো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যানসহ, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে- তা বরাবরের মতো অন্ধকারে রয়ে গেছে। রানা প্লাজা ভবন ধসের পর কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। এসব দুর্ঘটনা কি নিছক দুর্ঘটনা নাকি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড? দুর্ঘটনাগুলো কি আকস্মিক নাকি অনিবার্য ছিল? কেউ বা কারা কি এর দায় নেবে না? বাংলাদেশে চাইলেই কি কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা যায়? প্রায় ১৭টি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়া কোনো শিল্প কারখানা স্থাপন করা যায় না। ফ্যাক্টরি প্ল্যান পাস করাতেই তো জমির কাগজপত্র লাগে, সাইট প্ল্যান, মাস্টার প্ল্যান লাগে, কনস্ট্রাকসন প্ল্যান লাগে, মেশিন লে আউট ও ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্লো চার্ট লাগে। তাহলে ভবন ধসের পর সংগতকারণেই প্রশ্ন উঠে, ভবন নির্মাণের অনুমতি দেন যারা, তারা কি দায়িত্ব পালন করেছিলেন? কারখানা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কি নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়? এখানে দুর্নীতি না দায়িত্বহীনতা কোনটা প্রধান সমস্যা? নাকি দুর্নীতির কারণেই নিয়ম থাকা সত্ত্বেও দায়িত্বে অবহেলা করা হয়েছিল? আইন নাগরিককে সুরক্ষা দেয়। প্রশ্ন উঠে সেখানেও। আইন কোনো ধরনের নাগরিককে সুরক্ষা দেয়? ক্ষমতাবানের ক্ষমতার সুরক্ষা নাকি দুর্বলের ন্যূনতম অধিকারের সুরক্ষা? একটি অপরাধ বা অন্যায়ের শাস্তি হলে যেমন অপরাধ প্রবণতা কমতে থাকে, তেমনি অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল স্পেকট্রাম কারখানার ভবন ধসে ৮০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর পর যদি যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হতো তাহলে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার দুঃখজনক ঘটনা হয়তো ঘটত না। রানা প্লাজা ভবন ধসের পর ২০১৩ সালে একটা রিট পিটিশন করা হয়েছিল । এখনো তার নিষ্পত্তি হয়নি। শ্রম আদালতে ১১টি ফৌজদারি মামলা ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলমান আছে। মামলার দীর্ঘ সূত্রতা যে বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা তৈরি করে, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রম আইন অনুযায়ী ৬০ কর্ম দিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে সময় লেগেছে ৬৩০ দিন অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের ১০ গুণ বেশি। আবার যেসব মামলার রায় ঘোষিত হয় সে রায় বাস্তবায়ন হয় না। রানা প্লাজা ধসের মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৫৯৪ জনকে। এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে, মাত্র ১৪৫ জনের। কবে শেষ হবে, এই সাক্ষী দেওয়া? আইন এবং আদালতকে উপেক্ষা করার এই নজিরকে উপেক্ষা করলে, আইনের শাসনের কথা যতই বলা হোক না কেন, তা অরণ্যে রোদন হবে। রানা প্লাজা ধসের পর শ্রম আইন সংশোধন হয়েছে দুবার। একবার ২০১৩ সালে আর একবার ২০১৮ সালে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ এবং পূর্ণ কর্মক্ষমতা হারানো আহতদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। মৃত্যুবরণ করলে পরিবার পাবে ২ লাখ টাকা এবং চিরস্থায়ী পঙ্গু হলে আড়াই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ। এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কি হাস্যকর নাকি উপহাসের শামিল, তা নিয়ে বিতর্ক করা যাবে। কিন্তু একজন মানুষের জীবনকে এবং জীবিকাকে যে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক করার প্রবৃত্তি নিশ্চয়ই কারো হবে না। দেশের জিডিপি বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে। এই আয় বৃদ্ধিতে শ্রমজীবীদের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। অথচ তাদের প্রতি দায়িত্ব প্রতি পদে পদে অস্বীকার করা হচ্ছে, এমনকি কর্মক্ষেত্রে নিহত বা আহত হওয়ার পরও। মাথাপিছু আয় ২৮৪০ ডলার হিসেবে একজন শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত, যেকোনো বয়সী নাগরিকের আয় বার্ষিক ৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকার বেশি। আর উৎপাদনের চাকা ঘোরান যারা তাদের জীবনের চাকা থেমে গেলে ক্ষতিপূরণ ২ লাখ টাকা। শ্রমিকের জীবন নিয়ে একি তামাশা নয়? এই তামাশা শেষে বিয়োগান্তক বেদনা ও অপমানে পর্যবসিত হয় যখন সেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্যও বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। রানা প্লাজা ভবন নির্মাণ হয়েছিল অবৈধভাবে, ফাটল দেখা যাওয়ার পর শ্রমিকরা কাজে যেতে চায়নি, তাদের জোর করে কাজে পাঠানো হয়েছে, শ্রমিকরা চাকরি হারাবার ভয়ে কাজে যোগ দিয়েছে, ভবনে জেনারেটর নিয়মানুযায়ী স্থাপন করা হয়নি, এসব তো বিবেচনা করা হয়ইনি বরং ভবন ধসের পর বিরোধী দলের কর্মীরা পিলার ধরে ঝাঁকি দিয়েছে বলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছিলেন। ৫টি কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন, কিন্তু কোনো ট্রেড ইউনিয়ন ছিল না সেখানে, এসব তথ্য কী প্রমাণ করে? শ্রম দপ্তর, পরিদর্শন দপ্তর এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কি দায় এড়াতে পারবেন? প্রতিটি দুর্ঘটনার পর এটি সাধারণ চিত্র যে, ভবন নির্মাণে ত্রুটি ছিল। রানা প্লাজা ধসের পর দেখা গেছে, ২৯টি ব্র্যান্ড রানা প্লাজায় অবস্থিত ৫টি ফ্যাক্টরিতে তৈরি পোশাকের অর্ডার দিত। তাদের কি কোনো দায় ছিল না, কর্মপরিবেশ দেখার ব্যাপারে? কিন্তু মুনাফাই তাদের কাছে ছিল প্রধান। একটা হিসাব দাঁড় করিয়েছিল, ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইন নামের একটি সংস্থা। তারা দেখিয়েছে, একটি টি-শার্টের বিক্রয় মূল্যের মাত্র দশমিক ৬ শতাংশ পান শ্রমিক অর্থাৎ ১০০ টাকার টি-শার্টে শ্রমিকের প্রাপ্তি মাত্র ৬০ পয়সা। কারখানা মালিক ৪ শতাংশ পান লাভ হিসেবে, ইউরোপ আমেরিকার নামকরা ব্র্যান্ড পায় ১২ শতাংশ আর ইউরোপ আমেরিকার বিক্রেতা পায় ৫৯ শতাংশ। ফলে শ্রমিকরা রক্ত পানি করা শ্রমে মুনাফা জোগায়, দেশি-বিদেশি মালিকদের। কাজ করতে গিয়ে শ্রমিক ভবনের নিচে চাপা পড়লে কিংবা আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করলে তা দেখা যায়। কিন্তু প্রতিনিয়ত যে লোভের আগুনে পুড়ছে কিংবা লাভ বা মুনাফার পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ছে তা কিন্তু সহজে চোখে পড়ে না। পৃথিবীর ২৯টিরও বেশি দেশ তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াকে পেছনে ফেলে, দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানির দেশ। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার দিক থেকে, পৃথিবীতে সর্বনিম্ন দেশের নাম বাংলাদেশ। ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে এই শিল্পে। তাদের মজুরি বাড়ে ধীরগতিতে, তারা অন্যায়ের শিকার হয়ে আদালতে গেলে মামলাগুলো প্রায় গতিহীন, কাজ করতে এসে প্রাণ হারালে ক্ষতিপূরণ নগণ্য, আইনে তাদের অধিকার সুরক্ষিত নয় বরং উপেক্ষিত আর শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া এবং ট্রেড ইউনিয়ন করার ব্যাপারে পদে পদে বাধা। যে কারণে ৪ হাজারের বেশি কারখানায় ইউনিয়নের সংখ্যা ১৩শর কাছাকাছি। এদের মধ্যে কতটা ইউনিয়ন শ্রমিক স্বার্থে কাজ করছে তা বুঝতে হলে, দেখতে হবে তারা ‘সিবিএ’ গঠন ও কার্যকর করতে পারছে কিনা? বকেয়া মজুরির জন্য রাস্তায় বিক্ষোভ এবং শ্রম ভবন ঘেরাও দেখে এটা স্পষ্ট যে, কারখানায় শ্রমিকদের আলোচনার সুযোগ এবং চর্চা নেই। রানা প্লাজা ভবন ধস দেখিয়েছে অনেক, কিন্তু শিখিয়েছে কিছু? ২০১৩ সালে গার্মেন্টস পণ্যের রপ্তানি ছিল ২১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৯ বিলিয়ন ডলার। যে শ্রমিকের উৎপাদনে রপ্তানি বাড়ছে সেই শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা, ন্যায্য মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের হার নির্ধারণ, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কাজ যে কত উপেক্ষিত প্রতিটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড, সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক