গল্প

বুকপকেট

আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম

মিষ্টি মেয়ে মিষ্টি। ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো অভিযানের শুরুর দিনেই। পরের বারো দিন মদ ছোঁয়া যাবে না। তাই আমার রুমে জমায়েত হয়েছিলাম রেজাসহ আরও চারজন। সবার হাতে আমার তৈরি ও সুদূর মেহিকো থেকে নিয়ে আসা মেস‌কাল। ছোট্ট একটি টোকা, দরজায়। এরপরই ধাক্কা দিয়ে ভেজানো দরজা খুলে ও ঢুকেছিল। সঙ্গী বারোজন মেয়ের কাউকে আশা করিনি। একটু অবাক হয়েছিলাম।

দেখি কী খান? বলে অবলীলায় আমার হাতের গ্লাস থেকে নিয়ে চুমুক দিয়ে বলেছিল, বাহ অতটা ঝাঁজ নেই। অত খারাপ লাগে না।

আপনার জন্য এক গ্লাস ঢালব? অনু জিজ্ঞেস করেছিল।

নাহ। নানার গ্লাস থেকে দু এক চুমুক দেব।

এদিক ওদিক তাকিয়েছিলাম। নানা মানে আমি! বয়স হয়েছে কিন্তু তাই বলে নানা! আমার গা ঘেঁষে বসেছিল।

সিউলে এখন বৃষ্টি হচ্ছে। অবিরাম। মিষ্টি জানালার সামনে বসা। হাতে সেলফোন। বৃষ্টির ফোঁটা একের পর এক কাচের গায়ে টোকা দিচ্ছে। ওদের ধাক্কা দিয়ে খোলার শক্তি নেই। কাচের ভেতর দিকটা ঘামছে। ঘামে সদ্য শেষ হওয়া খিঁচুনির সঙ্গে মিশে আছে ওর বগলতলার সুগন্ধ। ঝাপসা হাওয়া কাচটা  ক্রমেই ঠেলে দিয়ে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে বাইরের শহরটাকে। ও কিছু লিখছে না।

অভিযানের সপ্তম দিন। তাঁবুতে সবে ঢুকেছি। বন্ধু অনিক আগে থেকেই শুয়ে আছে। সারা দিনে হাঁটা পড়েছে বারো মাইল। হঠাৎ করেই মিষ্টি, হাতে ওর একগাদা জিনিসপত্র। সারাটা দিন আমাদের পেছনে পেছনে আসছিল। একটু আগে নিজের তাঁবুতে গিয়ে ঢুকেছে। কিছু বোঝার আগেই আমার পা থেকে মোজা খুলে এখানে দুষ্প্রাপ্য গরম জলে ব্যান্ডেচের টুকরো ভিজিয়ে মুছতে শুরু করে। ওর মাথার ক্যাম্প লাইটে অনিকের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। অনিকও আমার মতো অবাক হয়েছে।

ইশ যা ফুলেছে! দুটো বুড়ো আঙুলের নখই পড়ে যাবে। বলছিল মেয়েটা। ওর হাতের সুখ নিতে নিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আর ও সন্তর্পণে বের হয়ে গিয়েছিল, জানতেও পারিনি।

শেষের দিন রাত বারোটায় শুরু সামিট ডেতেও মেয়েটা আমার পেছনে জোঁকের মতো লেগেছিল। ভোর নটার পর চূড়ায় পৌঁছে ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।

পৌঁছে গেছি? সহজ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল। মাথা উঁচু-নিচু করে সায় দিয়েছিলাম।

আমার না ভীষণ ভয় করছিল!

কেন? জিজ্ঞেস করেছিলাম।

যদি তুমি পা হড়কে পড়ে যাও।

চলো, নামি।

কখন যেন আমি আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছি। 

আফ্রিকান সাভানা দলে চারটে গাড়ি। দ্য গ্রেট মাইগ্রেশন অনুসরণ করেছি। আমার পাশেই মিষ্টি। সারাক্ষণ আমাকে এটা ওটা দেখাচ্ছে। হঠাৎ গাড়ি গেল বিগড়ে। প্রায় সন্ধের এ সময়ে সিংহের রাজত্বে গাড়ি ভেড়ানো মানে দুঃসংবাদ! গাড়ির বাকি ছয়জনের জায়গা হলো অন্য গাড়িগুলোতে ভাগাভাগি করে। অন্য গাড়ির দরজা এসে আমাদেরটার দরজায় লাগলে দ্রুত লাফ দিয়ে উঠতে হচ্ছিল। আমাদের বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া যাবে না। একদম শেষে মিষ্টি। অন্যগুলোতে একজনের জায়গা হবে না। আমি স্বেচ্ছায় থেকে গেলাম। শেষ মুহূর্তে মিষ্টি জেদ ধরল। আমাকে রেখে কিছুতেই যাবে না। অগত্যা সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ক্ষীণ চাঁদের আলোয় পরবর্তী সাড়ে তিন ঘণ্টা সিংহ মামার খাড়া লেজ খুঁজে বেড়ালো তিন জোড়া চোখ। আমি মিষ্টি আর ড্রাইভার। ওদের দেখা অবশ্য পাইনি। কিন্তু ওখানেই ছিল। একবার গর্জন করে হাজিরা খাতায় নিজেদের নাম উঠিয়েছিল।

না, মিষ্টি আমাকে ভয়ে জড়িয়ে ধরেনি। মৃদু হেসে অভয় দিয়েছিল।

কিউবার হাভানা। সংকীর্ণ রাস্তায় হলুদ দেয়লের গায় পাশে স্তূপ করা আবর্জনা থেকে উঠে আসা নীল মাছি দেখে ও কুচকে উঠেছিল। ওড়নার কোনা তুলে নাকে চেপে ধরেছিল।

কিলিমাঞ্জারো অভিযানের শেষ দিন। নামছি তো নামছি। নিচে সবুজের সমুদ্র। ঢুকতেই ছোট একটা ঝরনা। ও রাস্তা ছেড়ে ভেতরে গিয়ে মুখ ধুয়ে নিল। তারপরই পা টিপে টিপে দ্রুত এসে আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। ওখানে একটি বানর, চুপচাপ বসা। আমার হাতে জল তুলে দিল মুখ ধোয়ার জন্য। একটু পর আবার রাস্তায়। ও প্রায় নেমে নেমে ছবি তুলছিল। আমি আগে বেড়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছি। ও আমাকে ধরে ফেলে আবার এগিয়ে যাচ্ছে।

শেষ বাঁকটা দেওয়ার আগে অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। ডান হাতটা বাড়ানো। তালুতে বেগুনি একটা ফুল। ঠিক বেগুনি নয়, নীলচে বেগুনি। তোমার জন্য ঠিক এটাকেই খুঁজছিলাম। বলল।

অবাক হলাম। ঠিক এ রকম ফুল রাস্তার দুপাশে লাখ লাখ রয়েছে। কথা না বাড়িয়ে হাত থেকে ফুলটি নিয়ে জিন্সের পকেটে রেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি। ও পেছনে। আবার আমাকে ধরে ফেলে অন্য আরেকটা ফুল দেয়।

আরেকটি? আমি অবাক হয়ে বলি।

না, ওইটিই। তুমি ফেলে দিয়েছিলে।

পকেটে হাত দিয়ে দেখি, ঠিকই, তলায় ছেঁড়া। ফুলটি নিয়ে এবার বুক পকেটে রাখি।

সিউলে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। মিষ্টির চোখে সেলফোনের বুকে সদ্য লেখা মেসেজ, হাতে মেসকালের গ্লাস, সামনে খিচুড়ি, ধোঁয়া উঠছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত