রুস্তমহাটের শতবর্ষী কামারপট্টি

টুংটাং শব্দে ঈদের ব্যস্ততা, আড়ালে বিলুপ্তির দীর্ঘশ্বাস

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ১১:২১ এএম

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রুস্তমহাটের শতবর্ষী কামারপট্টির কাছাকাছি পৌঁছাতেই কানে ভেসে আসে লোহা পেটানোর টুংটাং শব্দ। ভেতরে গিয়ে দেখা যায় হাপরের ফোঁসফাঁসে কাঠকয়লার আগুনে উত্তপ্ত লাল লোহায় আঘাত করে চলেছেন শাকাল ও আশীষ কর্মকার। এভাবে গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার কামারপট্টির লৌহশিল্পীরা। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগেও তারা ধরে রেখেছেন গ্রামীণ ও নগর জীবনে অর্থনীতির অন্যতম বলয়। কামারপট্টির লোহা-লক্করের আওয়াজ, হাপরের ফোঁসফাঁস আর হাতুড়িপেটার টুংটাং শব্দ এই সময়ের সবচেয়ে আনন্দ আর উৎসবের।

সামনে যে কোরবানির ঈদ। কোরবানির দিন যতই ঘনিয়ে আসছে,কামারদের ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। তবে আনন্দের এই ব্যস্ততায় তাদের মধ্যে নানাবিধ উদ্বেগও পরিলক্ষিত হয়েছে। কেউ কেউ কাজ করলেও পরিষ্কার বোঝা যায়,অনেকটা নেতিয়ে পড়েছে এ ঐতিহ্য। কেউ কেউ বলছেন,আর কয়েক বছর পর এখানে কামারপট্টিই থাকবে না। তারা মনে করছেন কালের বিবর্তনে একটি সময় হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে এ পেশা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন মানুষের কাছে এ শিল্পের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে। বংশপরম্পরায় চলে আসা একসময়ের ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাচ্ছে।

বলা হয়, একশ বছর আগেও রমরমা ছিল রুস্তমহাটের এই কামারপট্টি। এমনকি দুই দশক আগেও এখানকার কামারপট্টিতে তৈরি জিনিসপত্রের কদর ছিল চট্টগ্রামজুড়ে। ওই সময়ের কামারপট্টির বিশটি দোকানের মধ্যে নয়টি এখনও বংশ পরম্পরায় ধরে রেখেছে এই শিল্পের বৈঠা। আগে প্রতিবারই কোরবানির ঈদের প্রাক্কালে কামারপট্টিতে দাঁড়ানোর জায়গা মিলতো না। এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে আধুনিক মেশিনে দা-ছুরির শান আর বাজারে আধুনিক স্টিল ও লোহার তৈরি জিনিসপত্র পাওয়ায় প্রাচীন পদ্ধতিতে তৈরি লোহার উপকরণের প্রতি আগ্রহ নেই মানুষের।

কামারপট্টির কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা যায়,কামার শিল্পীরা কেউ দা-বটি বানাচ্ছেন। অনেকে আবার সেগুলোকে ধার দিচ্ছেন। সামনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এসব জিনিস। তবে ক্রেতার তেমন উপস্থিতি নেই। কেউ আসছেন, দামদর করে আবার চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ পুরোনো দা-ছুরি নিয়ে আসছেন শান দিতে। 

কামারদের তথ্য মতে, উপজেলার রুস্তমহাটসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে অন্তত ৩৫টি কামারশিল্পের দোকান রয়েছে। ঈদের সময়টাতে এসব দোকানের শ্রমিকদের মুখের হাসি কিছুটা চওড়া হয়। তাতে ভাগ্যের পরিবর্তন খুব একটা হয় না।

কামারপট্টির বাদল কর্মকার বলেন, অন্যবার কোরবানির ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই মানুষ কেনাকাটা শুরু করেন। কিন্তু এবার এখনো তেমন কোনো ক্রেতা আসছেন না। তবে ঈদের দুই এক দিন আগে ক্রেতাদের সমাগম বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। 

অন্যদিকে কোরবানির ঈদ এলে এসব লোহার জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় বলে দাবি ক্রেতাদের।

অনীল কর্মকার জানান, এখন লোহা আর কয়লার দাম বেশি। এজন্য জিনিসের দামও বাড়াতে হয়েছে। এখন দা-বটির দাম ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা। আগে যা ছিল ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। ধামার দাম সাইজ বুঝে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। ছুরি ছোট-বড় ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। পশু জবাইয়ের ছুরি ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। আগের চেয়ে প্রত্যেক জিনিসে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি।

ছয় দশক যাবত পারিবারিক ব্যবসা ধরে রেখেছেন মিলন কর্মকার (৭৫)। বাবার হাত ধরেই দশ বছর বয়সে কামারপট্টিতে ঢোকেন তিনি। ৬৫ বছর এক দোকানেই কেটেছে তার। দেখেছেন দা, ছুরি, দামা, কুড়াল বানানোর সোনালী সময়। এখন দেখছেন খরা। দোকানে মন খারাপ করেই বসে থাকতে দেখা গেল তাকে। জানতে চাইলে তিনি বলেন,কয়েক বছর আগেও দা-ছুরি কেনা ও ধার দেওয়ার জন্য মানুষ লাইনে দাঁড়াতো। কোরবানির ঈদ এলে দিন-রাত কুল পেতাম না। এখন আর সেদিন নেই। পেশাটাই যেন শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিশোধ নিচ্ছে। দা,ছুরিই যেন আমাদের আয়-রোজগার কেটে নিয়ে গেছে।

তবে এখনো এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে জানালেন প্রদীপ কর্মকার। তিনি বলেন,সরকার কত পদক্ষেপ নেয়। আমাদের জন্য কেউ কিছু করল না। আমাদের পেটে ভাত ওঠে না। বিনা সুদে ঋণ পেলে ব্যবসাটি টিকিয়ে রাখতে পারতাম। শত বছরের একটা শিল্পও টিকে থাকত।

এদিকে শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্টপোষকতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা জানালেন আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো,মহিন উদ্দিন। তিনি বলেন,আমাদের কামার শিল্প অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। এর কারণ মানুষ দিন দিন আধুনিক প্রযুক্তির জিনিসপত্রের দিকে ঝুঁকছে। এ দেশের প্রত্যেকটি শিল্পই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই এটি টিকে থাকুক। আমরা এ শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে তাদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত