অতীত থেকে সম্প্রতি, শিশুর প্রতি যে ভয়ংকর অত্যাচার হচ্ছে দেশের জনগণ তাতে আতঙ্কগ্রস্ত। এর মূল কারণ, আইন প্রয়োগে যথার্থ কার্যকারিতা বা শিথিলতা রয়েছে। আদালত থেকে অভিযুক্তের সহজে মুক্ত হয়ে আসার কূটচাল বন্ধ করা না গেলে, এর ব্যাপকতা সমাজকে ধ্বংসের তলানিতে পৌঁছে দিতে পারে। বিশ্বজুড়ে শিশুরা যৌন হয়রানি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং অবহেলাসহ নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশেও শিশুরা প্রতিনিয়ত এমন কদর্য পরিস্থিতির সম্মুখীন। সম্প্রতি শিশুর প্রতি পৈশাচিকতার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত মাসে রাজধানীর পল্লবীতে, শিশু রামিসাকে খুন ও লাশ টুকরো করার ঘটনা দেশের বিবেকবান মানুষকে শিহরিত করেছে। শিশুর প্রতি এমন বর্বর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানীদের অভিমত, যে কোনো অপরাধ সংঘটনের জন্য শিশুরা খুব সহজে নাগালে আসে এবং তারা কিছু বুঝে উঠতে পারে না। কখনো পরিবারের বড় সদস্যদের শায়েস্তা করতে অপরাধীরা শিশুদের ‘বলির পাঁঠা’ বানায়। মানুষের দুর্বল জায়গায় আঘাত করার জন্য এটা করা হয়। বিষয়টি বিকারগ্রস্ত মানসিকতা ছাড়া কিছু নয়। আবার ব্যক্তি শত্রুতার জেরে শিশুহত্যা বা অপহরণের মতো ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ৬৪৩ শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি মাসে নিহত হয়, ৩২ জনের বেশি শিশু। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে ৫১৯ জন নির্যাতিত শিশুর মধ্যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩২৪ জন। উল্লেখ্য সময়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৯৫ শিশু। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে শিকার হয়েছে ২৯৪ শিশু। এর মধ্যে ধর্ষিত হয়েছে অন্তত ৬৮ জন। যাদের ৪৪ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরে দেশে মোট ২ হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালে ৪৫৬টি, ২০২৪ সালে ২৩৪টি, ২০২৩ সালে ৩১৪টি, ২০২২ সালে ৫৬১টি এবং ২০২১ সালে ৭৭৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে গড়ে প্রায় ৪৪৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একইভাবে বছরগুলোতে বেড়েছিল শিশু ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা। সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে ২০২৬ সালের এ পর্যন্ত ৩৪টি, ২০২৫ সালে ১৬৭টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি, ২০২৩ সালে ৮৫টি, ২০২২ সালে ১০১টি এবং ২০২১ সালে ১৮৫টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২১ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের দাবি, পৃথিবীতে প্রতি ৮ জনে একজন নারী ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার। প্রতি বছর যত সংখ্যক শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা রিপোর্ট হয়, সেখানে ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশই ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরী।
ধর্ষণ, সহিংসতা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আরএআইএনএন-এর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ১০০টি যৌন নির্যাতনের ঘটনার ৯৩টির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ভুক্তভোগী শিশুর পরিচিত কেউ থাকে। এর মধ্যে পরিবারের সদস্য ৩৪ শতাংশ আর পরিচিত থাকে ৫৯ শতাংশ। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন গবেষণা সূত্রমতে, বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রে পরিচিতদের দ্বারা শিশুরা যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হয়। ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘চাইল্ড সেক্সুয়াল এবিউজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে যে দুর্বৃত্তরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ। কয়েক বছর পূর্বে করা অপরাধীর আচরণ ও বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ওপর যৌথ গবেষণায় দেখা যায় শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটনায়ই পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা পরিচিত মানুষ জড়িত থাকে; অপরিচিতরা নয়। উক্ত গবেষণায় প্রতিফলিত যে, যৌন সহিংতার ঘটনায় মাত্র ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে অপরাধীরা ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি, ৩৩ শতাংশের ক্ষেত্রে ছিল শিশুর আত্মীয় এবং ৪২ শতাংশের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছিল পরিচিত কেউ।
বিশ্লেষকদের মতে সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দরিদ্র ভুক্তভোগীদের মামলা চালানোর সামর্থ্যরে অভাব এবং আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতির কারণে শিশু অপরাধ বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ঘটনাগুলো কিছুদিনের জন্য আলোচনায় এলেও, আড়ালে থাকা অসংখ্য ঘটনা বছরের পর বছর হিমাগারে থাকে। এমনকি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা ঘটনাগুলোও সহজে বিচারের মুখ দেখে না। আদালতের জিআর শাখা সূত্রে জানা যায়, ঢাকার বিভিন্ন আদালতে শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত মামলা আছে প্রায় ৩ হাজার। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার ৫০টি থানায় সব ধরনের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়েছে অন্তত ২১৪টি। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নথিভুক্ত মোট ১ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টি মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ের হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা। যার পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৯৩৬টি। মানবাধিকার কর্মীদের ভাষ্যমতে, দেশজুড়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের ফলে মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে আইন করা হলেও নারী নির্যাতন বা ধর্ষণ কমছে না। এজন্য অপরাধীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক অবস্থান না দেখে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি সংঘটিত রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের বিচারব্যবস্থার মতো প্রত্যেক ঘটনার দ্রুততম তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম চলমান থাকলে, অবস্থার পরিবর্তন আশা করা যায়। কারণ এই হত্যাকা-ের রায় আগামীকাল। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, মূল অপরাধীই শাস্তি পাবে। এভাবে যদি সমস্ত নারী-শিশু হত্যা ও ধর্ষণ মামলার বিচার হতো, তাহলে আমাদের সামাজিক চরিত্র ভিন্নভাবে প্রকাশ পেত। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে ছদ্মবেশে নষ্ট চরিত্রের ব্যক্তিদের কারণে এসব ঘটনার অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফৌজদারি আইনের দুর্বলতায় অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বহুলাংশে আইন প্রয়োগে দেশপ্রেম-নীতিনৈতিকতার অভাবে ধর্ষণ মহামারী রূপ পরিগ্রহ করেছে। তাই আইন প্রয়োগে জনতার অংশগ্রহণ ও সামাজিকভাবে ধর্ষকদের ছবি বা পোস্টার এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে এদের চরিত্র স্খলনের বিষয়টি জনসম্মুখে আনা যেতে পারে। তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক না রেখে সামাজিকভাবে সর্বত্র তাদের চলাফেরায় সীমাহীন লজ্জা বা অপমান করে দেশে লজ্জার সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। কারণ লজ্জার সংস্কৃতির অভাবেই একটি পরিবার নির্লজ্জ হয়ে তার ধর্ষক ছেলে, ভাই ও আত্মীয়দের বাঁচাতে আসে। জাপানে একজন মানুষ সাধারণ লজ্জায় আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। অথচ এদেশে ধর্ষণ করে মিষ্টি খাওয়ানোর অপসংস্কৃতি চালু ছিল। যেসব পুরুষ এ ধরনের অপরাধ একের পর এক করে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে অপরাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার গোপনীয় যোগসূত্র অনেক ক্ষেত্রে প্রতীয়মান। ফলস্বরূপ পুলিশ ও মেডিকেল রিপোর্ট এবং সর্বোপরি বিচার বিভাগ কর্তৃক ন্যায়বিচার পাওয়া সুদূর পরাহত বিষয়ে পরিণত। বিচারহীনতা-সহিংসতার সঙ্গে সন্ত্রাসীর পেশিশক্তির সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে আইন প্রণয়ন-বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়াও হতদরিদ্রদের বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে লিগ্যাল এইড ফান্ডের মাধ্যমে মামলা চালাতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে বসানো হয়েছে নতুন নতুন ট্রাইব্যুনাল। দেশব্যাপী নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের সেবাপ্রাপ্তির সুবিধার্থে ২০১৩ সালে ৪৭টি জেলা সদর হাসপাতাল এবং ২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬৭টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল স্থাপন করা হয়েছে। নির্যাতিতদের মনোসামাজিক কাউন্সেলিং সহায়তাকে বেগবান করতে ঢাকায় ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টার এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিজিওনাল ট্রমা সেন্টার স্থাপিত হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০’, ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন -২০১০’, ‘মানবপাচার (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০’, ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২’, ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭’সহ নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১৩-২০২৫) প্রণয়ন করা হয়েছে। এতদ সত্ত্বেও এসব জঘন্য অপরাধের পেছনে কোন ধরনের অপশক্তি অতিমাত্রায় সক্রিয় এবং সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে কারা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে লিপ্ত রয়েছে তাদের মুখোশ উন্মোচন অপরিহার্য। দায়িত্বশীলতা-পেশাদারিত্বের উৎকর্ষতায় এলাকাভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে, দ্রুততার সঙ্গে এসব হিংস্র পশুদের চিহ্নিত করে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে কঠোর আইনের আওতায় আনা সময়ের ন্যায্য দাবি।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
