নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যবসার বাজেট

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০২:৩০ এএম

ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমুক্ত (ডিরেগুলেশন) পরিবেশ তৈরিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানিমুখী ব্যবসায়ীদের একটি বড় দাবি ছিল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ। এতদিন যাদের নিজস্ব বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ছিল না, তারা বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতেন। নতুন বাজেটে এ সীমাবদ্ধতা দূর করা হয়েছে।

গতকাল রবিবার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) অডিটোরিয়ামে ‘অর্থবিল ২০২৬-২৭-এর বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। অনুষ্ঠানে এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (মূসক) বদরউদ্দিন মুন্সী, কাস্টমস নীতির প্রথম সচিব তারেক হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বলছিলেন আমি রপ্তানি করি, আমার বন্ডেড ওয়্যারহাউজ আছে; কিন্তু আরেকজন রপ্তানি করেও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা পায় না। সে কোথা থেকে মাল কিনবে? এবার আমরা বলেছি, তারাও বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল কিনতে পারবে।’

তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়বে। আবদুর রহমান খান আরও জানান, আগে ধারাবাহিকভাবে বন্ড সুবিধা সীমিত ছিল এবং অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কাঁচামাল আমদানি করতে হলে কমিশনারেটের অনুমোদন নিতে হতো। এবার সেই সুবিধা আন্তঃকমিশনারেট পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আগে মাত্র কয়েকটি খাত বন্ড সুবিধা পেত। এখন যেকোনো খাতের উদ্যোক্তা আবেদন করলে বন্ড লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, যেসব ব্যবসায়ী বন্ড লাইসেন্স নিতে চান না, কিন্তু ডিউটি-ফ্রি আমদানি করতে আগ্রহী, তাদের জন্যও নতুন সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে তারা ডিউটি-ফ্রি কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন।

অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সুবিধা নিয়েও সংস্কারের কথা তুলে ধরেন আবদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এই লাইসেন্সের আওতায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য খালাসের সুবিধা পান এবং তাদের পণ্য বন্দরে নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াই ছাড় করা সম্ভব হয়। কিন্তু অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আবেদন করছিল না। অডিট রিপোর্ট করদাতার হাতে থাকে না। তাই এইও সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অডিট রিপোর্টের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে, যাতে আরও বেশি ব্যবসায়ী এ সুবিধা নিতে পারেন।’

এনবিআর চেয়ারম্যানের ভাষ্য, বন্ড ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণে একগুচ্ছ সংস্কার আনা হয়েছে, যা বিনিয়োগ ও রপ্তানি কার্যক্রমকে আরও সহজ করবে।

এ ছাড়া আবদুর রহমান জানান, এবারের বাজেট প্রণয়নে সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ না বাড়ানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও বিশ্লেষণের পর বাজেটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোভিড-১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমেছে। এ অবস্থায় অর্থনীতির চাকা আবার সচল করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, এবারে যে সুবিধাটা দেওয়া হয়েছে সেটার সঙ্গে কালোটাকার সম্পর্ক নেই। কারণ মৌজা রেটের কারণে একজন যদি ১০ কোটি টাকা দিয়ে বিক্রি করা একটি ফ্ল্যাট ২ কোটি টাকায় নিবন্ধন করেন তাহলে সে বাকি টাকা কীভাবে দেখাবে। এই সংকটটা জানা। এজন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে বাকি টাকার কর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিক্রেতা যদি সেটা না করেন, আর এনবিআর যদি ধরে তাহলে তো জরিমানাসহ ট্যাক্স নেওয়া হবে। এর সঙ্গে কালোটাকা সাদা করার কোনো বিষয় নেই। এজন্য এই বিষয়টা গত বছরেই আইনে আনা হয়েছে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত