রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে হাইকোর্ট। গতকাল রবিবার বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ দুজনের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে। গত বৃহস্পতিবার সোহেল ও স্বপ্না কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জেল আপিল করেন। আপিলে সোহেল দোষ স্বীকার করে হাইকোর্টে ক্ষমা চেয়েছেন।
গত ৭ জুন ঢাকার একটি আদালত রামিসা হত্যা মামলায় আসামি সোহেল ও স্বপ্নাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডা দেশের রায় দেয়। এরপর ৯ জুন দুজনের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- অনুমোদনের নথি) হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী অধস্তন কোনো বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদন্ডের রায় হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টে শুনানি সাপেক্ষে অনুমোদন লাগে।
গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেল তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আদেশটি (শুনানির জন্য গ্রহণ) তারা (আদালত) সেকশনে পাঠিয়ে দেবেন। আমরা প্রত্যাশা করি, সেটি যাওয়ার পরেই রামিসা হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ড রেফারেন্স শুনানির প্রস্তুতির কাজ অনেক দূর এগিয়ে যাবে, পেপারবুক তৈরি হয়ে যাবে। জেল আপিলে সোহেলের আরজি উল্লেখ করে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘মূল দ-প্রাপ্ত আসামি আপিলের গ্রাউন্ড হিসেবে বলেছে ‘আমি আর্থিকভাবে অসচ্ছল, অটোরিকশা গ্যারেজে মিস্ত্রির কাজ করতাম, আমি নিয়মিত ইয়াবা বা মাদকাসক্ত ছিলাম। নেশাগ্রস্ত হওয়ার কারণে পরিবারে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকত। এই মামলার ভিকটিমের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা মাদকাসক্ত ও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় হয়েছে। আমার আর্থিক অভাব, পারিবারিক অশান্তি, মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও অবচেতনভাবে হয়েছে। কীভাবে যে ঘটনাটি ঘটেছে আমি বুঝতে পারিনি। আমার একটি মাত্র ছেলের পড়াশোনা খরচ ও পরিবারের ভরণ-পোষণ করার মতো কেউ নেই। আমি ভুল করেছি, আমি ক্ষমা চাই।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘জেল আপিলের যে কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন, তার মাধ্যমে প্রকারান্তরে তিনি ঘটনা স্বীকার করেছেন। তিনি পারিবারিক অশান্তি ও মাদকাসক্তির মতো কয়েকটি বিষয়ের কথা বলেছেন। এগুলো আপিল করার ক্ষেত্রে অনেকেই নিয়ে থাকেন। তবে নিম্ন আদালত যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দিয়েছে কি না, চূড়ান্ত বিচারে সেটিই বিবেচনা হবে।’
গত ১৯ মে পল্লবীতে রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে বাসার জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২১ মে আসামি সোহেল রানা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। গত ২৫ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. অহিদুজ্জামান আদালতে সোহেল ও স্বপ্নাকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশের পর ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষে ১৬ জন সাক্ষ্য নিয়ে ওই দিন সাক্ষীদের জেরা শেষ হয়। পরদিন ৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি হয়। পরে ৪ জুন যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে ৭ জুন রায় হয়।
হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির গঠন করা হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল রবিবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে এ কার্যক্রম শুরু হয় বলে সাংবাদিকদের জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত (নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা) ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) তথা মৃত্যুদন্ডের মামলাগুলো শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছিলেন। সেটির আজ (গতকাল) ছিল প্রথম কার্যদিবস। এই কোর্টে ২০টি মামলা আছে। তার মধ্যে মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলাও রয়েছে। তিনি বলেন, আদালতে বলেছি, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের পক্ষ থেকে কোনো মামলায় মুলতবি গ্রহণ করা হবে না।
এর আগে অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনজীবীদের আবেদনে গত ১০ জুন বিশেষ এই বেঞ্চ গঠন করেন প্রধান বিচারপতি। এই বেঞ্চে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক মামলাগুলোর শুনানি হবে। ইতিমধ্যে এই বেঞ্চ গঠনের পর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানির জন্য একটি আইনজীবী প্যানেল গঠন করা হয়েছে। যার নেতৃত্বে আছেন অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেই।