বিশ্বকাপ মঞ্চে পারফর্ম করব কখনো ভাবিনি

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১২ এএম

কানাডার টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জমকালো উদ্বোধনী আসরে বিশ্বখ্যাত তারকা নোরা ফাতেহি ও ভেজেড্রিমের সঙ্গে একই মঞ্চে মেতেছিলেন বাংলাদেশি-আমেরিকান সংগীত প্রযোজক ও ডিজে সঞ্জয় দেব। বিশ্বসংগীতের মানচিত্রে বাংলাদেশের শিকড়কে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের এই গুণী শিল্পী সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, অতীত সংগ্রাম ও বিশ্বমঞ্চের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন  দেশ রূপান্তরের সঙ্গে।

সঞ্জয় দেবের কাছে প্রথম প্রশ্ন-‘ফিফা বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ বৈশ্বিক আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করলেন, মঞ্চের সেই মুহূর্তটি আসলে কেমন ছিল?’ সঞ্জয় বললেন, সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে এখনো নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে! এই বিশেষ মুহূর্তটির জন্য আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছি। নিখুঁত একটা পরিবেশনা উপহার দিতে পোশাক তৈরি করা থেকে শুরু করে মহড়া আর দীর্ঘ প্রস্তুতিতেই প্রচুর সময় কেটেছে। তারপর হঠাৎ করেই একদিন নিজেকে ফিফা বিশ্বকাপের সেই বিশাল মঞ্চে আবিষ্কার করলাম। আর মাত্র তিন মিনিটের মাথায় পুরো পারফরম্যান্সটি শেষ হয়ে গেল!

সঞ্জয় জানান, মঞ্চ থেকে নামার পর বাবা সন্তোষ দেব, মা শিখা দেব ও নানু-দাদুর কথা ভাবছিলাম। দাদু বেঁচে নেই। আমি জানি ওপার থেকে তিনি আমাকে দেখছেন এবং আশীর্বাদ করছেন। একই সঙ্গে আমার পুরো টিম এবং যারা এই দীর্ঘ যাত্রায় আমার পাশে ছিলেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে উঠেছিল। এমনকি শৈশবের সেই ছোট্ট সঞ্জয়ের কথাও মনে পড়ছিল, যে একসময় নিজের ঘরে বসে একা একা এমন একটা বৈশ্বিক মঞ্চের স্বপ্ন দেখত।

উদ্বোধনী আসরে আপনাদের অফিশিয়াল গান ‘সির সির’তো রীতিমতো রেকর্ড গড়েছে এই গানটির বৈশ্বিক সাফল্যকে কীভাবে দেখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সঞ্জয় জানান, ৮ জুন ফিফার অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে গানটি প্রকাশের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছিলাম। এখন এই গানের ভিউ ৫ কোটি। মুক্তির মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটি ২ কোটির বেশি ভিউ পেয়ে রেকর্ড গড়বে, ভাবিনি। উদ্বোধনী আসরের আরেক অফিশিয়াল গান শাকিরার ‘দাই দাই’-এর প্রথম দিনের ভিউকেও এটি ছাড়িয়ে গেছে। ফরাসি হিপহপ তারকা ভেজেড্রিম ও বলিউড সেনসেশন নোরা ফাতেহির সঙ্গে এই গানে মঞ্চ মাতানো এবং কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মন জয় করতে পারাটা দারুণ এক প্রাপ্তি।

সঞ্জয় জানালেন, বড় হওয়ার দিনগুলোতে কখনো ভাবিনি যে, সত্যিই একদিন ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার সুযোগ পাব। তাই যখন সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপ নিতে দেখলাম, তখন আবেগ ধরে রাখা কঠিন ছিল। আর সেই আবেগ থেকেই নিজের শিকড় আর জন্মভূমি বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি। পারফরম্যান্সের সময় পোশাকে বাংলাদেশের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে বিশ্ববাসীর সামনে বারবার মেলে ধরেছি। স্টেডিয়ামের দর্শকসহ বিশ্বজুড়ে থাকা বাংলাদেশিরা যেভাবে এটিকে গ্রহণ করেছেন, তা আমাকে গর্বিত করেছে।

নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে সঞ্জয় বললেন, আমার জন্ম শ্রীমঙ্গলে। প্রায় দুই যুগ আগে মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাই। ক্যালিফোর্নিয়াতে বড় হলেও তিন বছর বয়স থেকেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু করেছিলাম। এরপর ১৩ বছর বয়সে ল্যাপটপে ‘রিজন’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক জগতে আমার পথচলা শুরু হয়। বিভিন্ন সংস্কৃতির সংগীতকে এক সুতোয় গেঁথে ফিউশনধর্মী ধারা তৈরি করাই ছিল আমার লক্ষ্য, যা আন্তর্জাতিক সংগীত অঙ্গনে আমাকে একটা পরিচিতি এনে দেয়। এ বছর ডিসেম্বরে আমি ৩৫ বছরে পা দিতে যাচ্ছি। এই জন্মদিনের আগে এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।

বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে কেমন লাগছে এমন প্রশ্নের জবাবে সঞ্জয় জানান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সবসময় নিজের দেশের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চেয়েছি। বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন গুণী শিল্পীর সঙ্গে আমার নিয়মিত কাজ করা হয়েছে। আমার সংগীত পরিচালনায় হাবিব ওয়াহিদ, তাহসান খান ও জেফার রহমানের সঙ্গে বেশ কিছু গান প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে হাবিব ও মুজার সঙ্গে ‘একলা দুনিয়া’, তাহসানের সঙ্গে ‘ভুলে যামু, এবং জেফারের সঙ্গে ‘ আড়ালে হারালে, গানগুলো শ্রোতারা দারুণভাবে গ্রহণ করেছেন, যা আমাকে সবসময় দেশের জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত