নেশার কারবারে রাজনৈতিক ‘কোলাকুলি’

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০২:০৬ এএম

দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কারবার চালিয়ে আসছেন বিএনপি নেতা ফাইয়াজ ওরফে মুন্না। তিনি রাজধানীর পল্লবীর ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক। আওয়ামী লীগের আমলেও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে কারবার চালান। দল ক্ষমতায় এলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। গত ৬ জ্নু মিরপুর সাংবাদিক কলোনির সামনে অভিযান চালিয়ে ডিবি ইয়াবা ও হেরোইনসহ ধরে মুন্নাকে। এ ঘটনার সপ্তাহখানেক পর নোয়াখালীর চাটখিলে একটি মাদক আস্তানা থেকে ধরা হয় আওয়ামী লীগ নেত্রী ববিতা আকতার সুমাইয়াকে। ভিমপুর গ্রামের বেদেপল্লীতে একটি ঝুপড়িঘরে সিসি ক্যামেরা ও এসি লাগিয়ে মাদক কারবার চালান তিনি। পুলিশ পুরো আস্তানাটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

শুধু বিএনপির মুন্না কিংবা আওয়ামী লীগের ববিতাই নন; তাদের মতো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক কারবার চালিয়ে আসছেন। সব আমলেই তারা মিলেমিশে এ মাদক কারবার চালান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযান ও নজরদারির মধ্যেও থেমে নেই তাদের কারবার। মিয়ানমার ও ভারত থেকে মাদকের চালান এনে সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে কক্সবাজার, টেকনাফ ও উখিয়ায় দেদারসে আসছে মাদকের চালান। মাদক সম্রাট আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রহমান বদি কারাগারে থাকলেও তার অনুসারীরা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে আঁতাত করে মাদক কারবার চালাচ্ছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর একটি তালিকা করেছে। ওই তালিকায় সারা দেশের এক হাজার ২১৭ জনের নাম এসেছে। তার মধ্যে আশ্রয়দাতার সংখ্যা ১৭২ জন, যার অধিকাংশই রাজনৈতিক নেতা।

জানা যায়, পুলিশের হাতে ধরা পড়া নোয়াখালীর ববিতা প্রায় দ্ইু যুগ ধরে মাদক কারবার চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের সময় নিজেকে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও ওবায়দুল কাদেরের ভাগ্নি পরিচয় দিয়ে প্রশাসনের নাকের ডগায় অপরাধ করে আসছিলেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর নিজেকে বিএনপি নেত্রী পরিচয় দিচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ববিতা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার করে আসছেন। একসময় আওয়ামী লীগের নেতাদের সহযোগিতায় শুরু করলেও বর্তমানে বিএনপির কিছু নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তিনি মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে চাটখিল থানা পুলিশ কয়েক দফায় তাকে ইয়াবাসহ আটক করলেও জামিনে বের হয়ে আবার শুরু করেন। তার বিরুদ্ধে থানায় সাতটি মাদক মামলা রয়েছে। এ পর্যন্ত ছয়বার আটক হয়েছেন ববিতা।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকমুক্ত দেশ গড়তে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। মাদক কারবারিদের কোনো অনুকম্পা দেখানো হবে না। এমনকি রাজনৈতিক নেতা হলেও কোনো ছাড় পাবে না। পুলিশের সবকটি ইউনিটকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মাদকের ধরন : সারা বিশ্বের ন্যায় আগামীকাল শুক্রবার বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস পালিত হবে। ১৯৮৯ সাল থেকে প্রতি বছর ২৬ জুন দিবসটি পালন হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্যানুযায়ী, দেশে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত গাঁজাসহ বিভিন্ন রকমের মদ ছিল সাধারণ মাদক। রাজস্ব আদায়ে সরকারি নিবন্ধিত দোকানেও বিক্রি হতো গাঁজা ও আফিম। আশির দশকের শেষ দিকে গাঁজা নিষিদ্ধ হলে এর জায়গা দখল করে হেরোইন। তবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর গাঁজার বাজার আরও বড় হয়। ভারত থেকে আসা কাশির ওষুধ হিসেবে পরিচিত ফেনসিডিল ২০০০ সাল পর্যন্ত বেশি প্রচলিত ছিল। পরে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়ে। এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে সিনথেটিক ড্রাগ। ২০০৫ সালের পর তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সস্তা মাদক হিসেবে ড্যান্ডির প্রচলন বাড়ে। এটি বেশি সেবন করে পথশিশুরা। ক্রিস্টাল মেথ, এলএসডি, ডিওবি, এমডিএমএর মতো মাদক শহরের তরুণরা সেবন করছে। বিভিন্ন অনলাইনেও পাওয়া যাচ্ছে মাদক।

পটপরিবর্তন হলেও নেটওয়ার্ক অক্ষুণœ : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, মাদক নির্মূলে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার হাতবদল হলেও দেশে মাদকের নেটওয়ার্ক রয়ে গেছে অক্ষত। টেকনাফ থেকে ঢাকা কিংবা সীমান্ত থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল মাদক কারবারের মূল নিয়ন্ত্রকরা সবসময়ই থেকে যাচ্ছেন অধরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও তালিকা থাকা সত্ত্বেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন গডফাদাররা। আওয়ামী লীগের কতিপয় প্রভাবশালী নেতা এখনো এ কারবারে পর্দার আড়াল থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং ব্যবসা সচল রাখতে তারা বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন গোপন আঁতাত। আর এ চক্রটিকে নির্বিঘ্নে কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্য। কেবল বাহক বা চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন আড়ালে।

ফাইলবন্দি গডফাদারদের তালিকা : বিভিন্ন সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিএনসি ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাদক কারবারিদের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করেছে। এ তালিকায় রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এ তালিকার কাউকে ধরা হচ্ছে না। তালিকাভুক্তরাা স্থানীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের স্পর্শ করলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এমন একটি অজুহাত তৈরি করে রাখা হয়। আবার মাদকসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার না হলে আদালতে মামলা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া কোনো নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হলেও তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। রাজনৈতিক চাপ বা তদবিরের কারণে এক সময় ফাইলগুলো চাপা পড়ে যায়।

রাজনীতি ভিন্ন হলেও মাদকে একাকার : বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চরম বৈরিতা থাকলেও মাদক-বাণিজ্যের আন্ডারওয়ার্ল্ডে তারা একাকার। ক্ষমতার হাওয়া যেদিকেই ঘুরুক না কেন, মাদক সিন্ডিকেটগুলো দ্রুত নিজেদের খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে নিজেদের মাদক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত কারবারিরা বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের কতিপয় নেতার সঙ্গে গোপন আঁতাত গড়ে তুলেছেন। ফলে টেকনাফ থেকে ইয়াবা ও আইস এবং ভারত সীমান্ত থেকে আসা ফেনসিডিল ও হেরোইনের চালান সারা দেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে ‘আগে যারা আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং করত, এখন তারা বিএনপির কিছু নেতার ছত্রছায়ায় মাদক বিক্রি করছে। শুধু রাজনীতির পালাবদল ঘটেছে, মানুষ আর কারবার একই আছে।’

রক্ষক যখন ভক্ষকে পরিণত : মাদক কারবারিদের রাজনৈতিক ছত্রছায়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা। মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারিদের সহায়তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। মহাসড়ক কিংবা সীমান্ত এলাকায় পুলিশের কতিপয় সদস্য নির্দিষ্ট টোকেনের বিনিময়ে মাদকের গাড়ি পার করে দেয়। অনেক সময় আসল কারবারিদের ছেড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আছে। আবার অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের একটি বড় অংশ নথিতে কম দেখিয়ে বাকিটা মাদক কারবারিদের কাছেই পুনরায় চড়াদামে বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। তা ছাড়া রাজনৈতিক তদবির ও মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে চার্জশিট থেকে মূল গডফাদারদের নাম বাদ দিয়ে কেবল বাহকদের আসামি করা হয়, এতে সহজেই তারা জামিন পেয়ে যাচ্ছে।

তরুণ প্রজন্মের ওপর ভয়াবহ প্রভাব : বর্তমানে বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও মাদকে আসক্ত হচ্ছে। মাদক কারবার বন্ধ না হওয়ায় দেশের তরুণ সমাজ ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এ মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। আর আসক্ত সন্তানদের কারণে পরিবারগুলো মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে এবং নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি এবং খুনের মতো অপরাধের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন : অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া মাদক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যারা দলমত নির্বিশেষে তালিকায় থাকা সব গডফাদারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক মামলায় জড়িত রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য সাধারণ অপরাধীদের চেয়েও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মাদক কারবারে উপার্জিত অর্থ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের আগে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, মাদক এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। অপরাধীদের নতুন কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা কার্যক্রম চলছে। রাজনৈতিক দলের কেউ জড়িত থাকলে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা হবে। দেশকে মাদকমুক্ত করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত