প্রাচীন আরবি সাহিত্যিকদের অন্যতম ইবনে নাবাতা আল-খতিব। তিনি ছিলেন শব্দের জাদুকর। তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি। প্রতিটি বাক্য শ্রোতার হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলত। শত শত বছর পেরিয়ে গেছে। আজও তার রচিত সাহিত্য পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি প্রচলিত জুমার খুতবার রচয়িতা।
এই মহান খতিব ও পণ্ডিতের পুরো নাম আবু ইয়াহইয়া আবদুর রহিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল ফারিকি। তিনি ৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান ছিল তৎকালীন মায়্যাফারিকীন নগরী। বর্তমানে এই এলাকাটি তুরস্কের দিয়ারবাকির অঞ্চলের সিলভানের অন্তর্গত।
ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে অসামান্য মেধার স্ফুরণ ঘটেছিল। আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র এবং ইসলামি জ্ঞানে তিনি অত্যন্ত দ্রুত ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তার প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং চমৎকার উচ্চারণভঙ্গি খুব অল্প বয়সেই তাকে সবার মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। চারপাশের মানুষ তার মেধা, প্রজ্ঞা ও ভাষাগত দক্ষতায় মুগ্ধ হতে শুরু করে।
জ্ঞানের অন্বেষণে একসময় তিনি সিরিয়ার আলেপ্পোতে পাড়ি জমান। সেই সময় আলেপ্পো ছিল জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য ও
সংস্কৃতির বিশাল কেন্দ্র। হামদানি শাসক সাইফুদ্দাওলা তখন সেখানকার ক্ষমতায় ছিলেন। সাইফুদ্দাওলার রাজদরবার ছিল সমসাময়িক পণ্ডিত, কবি ও সাহিত্যিকদের মিলনমেলা।
ইবনে নাবাতার অসাধারণ বক্তৃতা, উপস্থিত বুদ্ধি এবং অনন্য ভাষাশৈলী খুব দ্রুত শাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন করে সাইফুদ্দাওলা তাকে রাজদরবারের খতিব হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। এই নিয়োগ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এখান থেকেই তার খ্যাতি আলেপ্পোর সীমানা ছাড়িয়ে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাকর এবং অস্থিতিশীল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে মুসলিমদের তখন প্রায়ই যুদ্ধ চলত। যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখা ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন সময়ে ইবনে নাবাতা তার বাগ্মিতাকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
তিনি এমনভাবে জোরালো বক্তব্য রাখতেন, যা সৈন্যদের হৃদয়ে অসীম সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলত। আল্লাহর প্রতি নিখাদ নির্ভরতা এবং ইমানি চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সৈন্যরা নতুন শক্তিতে লড়াই করার অনুপ্রেরণা পেতেন। ভাষার সৌন্দর্যকে কীভাবে মানুষের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের কাজে ব্যবহার করতে হয়, তা তিনি ভালো জানতেন। তার প্রতিটি শব্দ যেন তীরের মতো শ্রোতার হৃদয়ে বিদ্ধ হতো এবং তাদেরকে আত্মিক শক্তিতে বলীয়ান করত।
ইবনে নাবাতা ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মাপের কবি। সমসাময়িক আরেক প্রখ্যাত কবি আল মুতানাব্বির সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সাহিত্য ও কবিতার বিভিন্ন আসরে তারা নিয়মিত মিলিত হতেন এবং নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করতেন। ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, আল মুতানাব্বি তার রচিত বহু কবিতা সবার আগে ইবনে নাবাতাকে শোনাতেন। এই চমৎকার সাহিত্যিক আদান প্রদান ইবনে নাবাতার গদ্য ও ভাষাশৈলীকে আরও নিখুঁত ও সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। তার রচনায় ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর বিখ্যাত ভাষণ সংকলন নাহজুল বালাগার সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বলে অনেকেই মত ব্যক্ত করেছেন। নাহজুল বালাগার গভীর অধ্যয়ন তার গদ্যকে অনন্য ছন্দ, প্রাঞ্জলতা ও অলঙ্কারে সাজিয়েছিল।
তার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও কালজয়ী কীর্তি হলো দেওয়ানুল খুতাব নামক খুতবার সংকলন। এই মহামূল্যবান গ্রন্থে মোট ১২৭টি খুতবা সংকলিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, তিনি নিজেই এই খুতবাগুলো অত্যন্ত যতœ সহকারে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন অথবা তার মৃত্যুর পর তার সন্তানরা এগুলো একত্র করেন। এই সংকলনের বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা বিস্ময়কর। এর মধ্যে ৩৮টি খুতবা আবর্তিত হয়েছে তাকওয়া, মৃত্যু, আখেরাতের প্রস্তুতি এবং আত্মশুদ্ধির মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে। আরও ১৫টি খুতবায় রমজান মাস, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং আশুরার মতো তাৎপর্যপূর্ণ দিনগুলোর ফজিলত ও করণীয় বর্ণনা করা হয়েছে। জিহাদের গুরুত্ব, মুসলিমদের সামাজিক দায়িত্ব এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা হয়েছে ১৮টি খুতবা। পাশাপাশি বৃষ্টি প্রার্থনা, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের মতো ঘটনা নিয়ে ১৬টি খুতবা রয়েছে। সমাজ সংস্কার, শাসকদের দায়িত্ববোধ এবং বিভিন্ন নৈতিক সংকট নিয়েও তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে খুতবা রচনা করেছেন। এই মহান সাধক ৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক