জ্যোৎস্নামাখা তেলাকুচা ফুল

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৯ এএম

পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের এ আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন। এ রকম এক আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম পাখিবিদ শরীফ খানের কাছ থেকে। গ্রীষ্মের এক দিনে গিয়েছিলাম তার ফকিরহাটের সাতশৈয়া গ্রামে। সে গ্রামের পথে পথে মাঠে মাঠে বনে-জঙ্গলে কত যে বুনোফুল ছিটানো! কত যে বুনোপাখি ডালে ডালে! পাকা লাল টুক টুক তেলাকুচা ফলে থই থই গাছ, সবুজ পাতায় ছাওয়া লতার শরীর, লতার গিঁটে গিঁটে ফুটে আছে রূপালি সাদা জ্যোৎস্নামাখা তেলাকুচার ফুল।

যাওয়ার সময়ই শরীফ খান একটা বিস্তীর্ণ মাঠের পাড়ে আঙুল তুলে দেখালেন। বললেন ওই যে জঙ্গলটা দেখছেন, ওর ভেতরেই রয়েছে দুর্লভ হালতি পাখির বাসা। ডিম পাড়ার আগে মেয়ে পাখিটা সন্ধ্যা পর্যন্ত সুরেলা মিষ্টি কণ্ঠে গান করে! কতবার যে তা দেখতে ঢুকেছি ওই জঙ্গলে! গ্রামের ভেতরে হলেও জঙ্গলটা প্রায় এক মাইল লম্বা। সেসব জঙ্গলের ভেতরে কত যে পাখি, বুনোফুল, বুনোগাছ। একটা ঝোপের ওপর লতিয়ে বেড়ে ওঠা কয়েকটা তেলাকুচা গাছ দেখলাম। কাচা-পাকা ফল ঝুলছে, ছোট ছোট পটোলের মতো। কাঁচা ফলগুলো সবুজ, পাকা ফল টমেটোর মতো টকটকে লাল। কয়েকটা পাকা ফল পাখিরা ঠুকরে খেয়েছে। ছায়াচ্ছন্ন জায়গাটার ভেতরে সাদা ফুল ফুটে জ্বলজ্বল করছে ঝোপটা।

তেলাকুচা বইয়ের নাম। এ ছাড়া এ গাছ তেলকুচ, কউচ্যাশাক, কুদ্রা, কুচিলা, তেলহচি, কেলাকুচ ইত্যাদি আঞ্চলিক নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম আইভি গোর্ড। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম কক্সিনিয়া গ্রান্ডিস (Coccinia grandis) ও গোত্র কিউকারবিটেসী। তেলাকুচা জংলাগাছ। এ দেশে যেখানে সেখানে জন্মে। লতানো বিরুৎ প্রকৃতির গাছ। কাঞ্জ ও পাতা নরম, সবুজ। পাতা পঞ্চভূজাকৃতি। কাণ্ডের গিঁট থেকে অকর্ষি বের হয় যা দিয়ে কোনো অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে লতিয়ে চলে। পাতার বোঁটার কোল বা লতার গিঁট থেকে ফুল ফোটে। ফল ঘণ্টা বা ফনেল আকৃতির, পাপড়ি পাঁচটি, পাপড়ির অগ্রভাগ বিযুক্ত ও সূঁচাল, সূক্ষ্ম পশমাবৃত, সাদা। ফল লম্বাটে ডিম্বাকার, অনেকটা ছোট পটোলের মতো, খোসার রঙ লম্বালম্বিভাবে সাদা রেখায়িত সবুজ, পাকলে হয় লাল। ফুল ফোটার পর ফল ধরে, সেসব ফল পাকে প্রায় চার মাস পর। শীতকাল ছাড়া বছরের অন্য সব সময়ে তেলাকুচার ফুল ও ফল ধরে। পুরনো গাছ মরে গেলেও মাটির নিচে থাকা মূল থেকে চারা গজায়, বীজ থেকেও চারা হয়। তেলাকুচা শাক হিসেবে খাওয়া যায়। ঔষধি গুণ আছে। পেটে সমস্যা ও বদহজম দূর করার জন্য শাক খাওয়ার প্রচলন আছে। গবেষণায় জানা গেছে, তেলাকুচায় প্রাকৃতিক ইনসুলিন আছে যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এ ছাড়া চর্বি ভেঙে দেহের স্থূলতা কমাতে সাহায্য করে তেলাকুচা।

তেলাকুচা বুনো ফুল হলেও বাংলা সাহিত্যেও সে বেশ কদর পেয়েছে। কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণের ‘পুঁই মাচা’ গল্পের শেষে তেলাকুচা ফুলের যে চমৎকার বর্ণনা রয়েছে তা শুধু দেখা না, উপলব্ধির। অন্নপূর্ণা তার ছোট মেয়ে রাধী ও পুটিকে নিয়ে পিঠে বানাচ্ছিলেন। তখন রাত। লোকসংস্কারবশত পুটি প্রথম বানানো পিঠাখানা শেওড়াগাছের তলায় থাকা ষষ্ঠীদেবীকে দেওয়ার জন্য যায়। সে গল্পের সেই পল্লী প্রকৃতিতে পিঠা, যাঁড়া ষষ্ঠী, তেলাকুচা ফুল ও জ্যোৎস্না যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠেছে ‘... দেখিতে দেখিতে মিঠে আঁচে পিঠে টোপরের মতন ফুলিয়া উঠিল। ... পুটি বলিল–মা, দাও, প্রথম পিঠেখানা কানাচে যাঁড়া ষষ্ঠীকে ফেলে দিয়ে আসি। অন্নপূর্ণা বলিলেন একা যাস নে, রাধীকে নিয়ে যা। খুব জ্যোৎস্না উঠিয়াছিল, বাড়ির পেছনে যাঁড়াগাছের ঝোপের মাথায় তেলাকুচা লতার থোলো। জোলো সাদা ফুলের মধ্যে জ্যোৎস্না আটকিয়া রহিয়াছে। ...’

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত