৪ বিভাগে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪০ এএম

আগামী তিন দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি বাড়তে পারে। এতে ওই সব বিভাগে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। গতকাল বুধবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রে এ তথ্য জানিয়েছে। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে গত চার দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে। গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি বেড়ে গেছে।

আগামী শনিবার পর্যন্ত এভাবে বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টিতে কিছু নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, যে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা তিন দিন থাকতে পারে। তবে শনিবার থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির কারণে দেশের উত্তর-পূর্ব, পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের কিছু এলাকায় নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

তবে বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদীর পানিই বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতিভারী এবং সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরাসহ উজান এলাকায়ও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। আগামী চার দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং সংলগ্ন ভারতীয় উজান এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, তিস্তা নদী আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। একই সঙ্গে সুরমা-কুশিয়ারা, গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, দুধকুমার, ধরলাসহ কয়েকটি নদীর পানিও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে গত চার দিনের দেশের বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

মিরসরাইয়ে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি : চার দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। অনেক বাড়িঘরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধানের বীজতলা ও সবজি ক্ষেত। এদিকে চলমান উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের বুধবারের পরীক্ষা স্থগিত ও বৃহস্পতিবার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা ও ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, ৫০ হেক্টর আউশ, ৫ হেক্টর আমন বীজতলা, ১৫ হেক্টর পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ইউএনও সোমাইয়া আক্তার বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিছু মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। খৈয়াছড়া ইউনিয়নে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। অন্য এলাকারও তালিকা হচ্ছে।

ভোলায় পানিবন্দি হাজারো পরিবার : টানা ভারী বর্ষণে উপকূলীয় জেলা ভোলার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত অব্যাহত বৃষ্টিতে জেলার ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরার বিস্তীর্ণ এলাকার সড়ক, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা এবং ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল এবং মনপুরার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন। পাউবো ভোলা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সøুইসগেট মেরামত এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

জলমগ্ন ময়মনসিংহ নগরী : টানা সাড়ে আট ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে ময়মনসিংহ নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি, হাটবাজার ও নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাসে অবস্থিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সাড়ে আট ঘণ্টায় ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি বছরে সর্বোচ্চ।

বুধবার সকালে নগরীর, হামিদ উদ্দিন রোড, সানকিপাড়া, আকুয়া, গোলকিবাড়ী, বলাশপুর, চরপাড়া, খাগডহর, গাঙ্গিনারপাড়, নতুনবাজার, জিলা স্কুল মোড়, কেওয়াটখালী, ভাটিকাশর, সেহড়া ও ধোপাখলাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ সড়কে হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি। অনেক বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ড্রেনের নোংরা পানি ঢুকে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনুজ্জামান সরকার জানান, বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে পানি নামতে শুরু করেছে। যেসব এলাকায় এখনো পানি জমে আছে, সেগুলোর পানি নিষ্কাশনে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কাজ করছে।

সেন্টমার্টিনে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : চার দিন ধরে ভারী বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে সেন্টমার্টিনে জোয়ারের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বীপের বাসিন্দারা জানান, স্বাভাবিকের চেয়ে জোয়ারের পানির উচ্চতা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সেন্টমার্টিনের বেশ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি ঢুকে পড়েছে নিচু এলাকার অনেক ঘরবাড়িতে। জরুরি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা। টেকনাফ ইউএনও এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে।’

পেকুয়ায় ৫০ ঘর তলিয়ে গেছে : কক্সবাজারের পেকুয়ায় টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও মাতামুহুরি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলায় তিন দিনে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৬৪৬ মিলিমিটার। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষান্মাসিক পরীক্ষা স্থগিত করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। টইটং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন জানান, ইউনিয়নের ৫০টির মতো বসতঘর তলিয়ে গেছে। ইউএনও রফিকুল ইসলাম বলেন, বেশ কিছু প্লাবিত স্থান পরিদর্শন করেছি। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে।

খোয়াই কুশিয়ারায় বিপদসীমা অতিক্রম : দুদিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ছে। ইতিমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানি। হবিগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, গতকাল বুধবার দুপুরের পর থেকেই খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে থাকে। চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে বিকাল ৬টায় পানি বিপদসীমার ১৬০ সেন্টিমিটার এবং কালনী কুশিয়ারা নদীর আজমিরীগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ ছাড়া করাঙ্গি, সুতাং ও সোনাইসহ জেলার সবকটি নদ-নদীতেই পানি বাড়ছে।

ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি : এদিকে হবিগঞ্জের মাধবপুরে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদী ও খালভাঙন। বহড়া ইউনিয়নের মনতলা-ভবানীপুর গ্রামে খালভাঙনে একের পর এক বাড়ি বিলীন হচ্ছে। ভিটেমাটি হারিয়ে কয়েকটি পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে শাহজাহানপুর ইউনিয়নের এক্তিয়ারপুর, জামালপুর, ভান্ডারুয়া ও শাহজাহানপুর গ্রামে শিমলা নদীর ভাঙনে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, ফসল ও মাছের পুকুর ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। স্থানীয়া দ্রুত নদী ও খালভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। অন্যথায় আরও অনেক পরিবার বসতভিটা হারাবে। ইউএনও মেহেদী হাসান বলেন, ‘ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর পর্যবেক্ষণ করছি। ক্ষতিগ্রস্ত চারটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা : দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র আগামী রবিবার পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। পর্যটক ও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে পূর্বে জারি করা নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটকদের ভ্রমণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে।

এদিকে ভারী বৃষ্টিপাতের মধ্যেও গতকাল চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২৬টি ফ্লাইটের সবকটাই শিডিউল অনুযায়ী নেমেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার ফ্লাইট শিডিউলে বিপর্যয় ঘটলে ভোগান্তিতে পড়েছিলেন যাত্রীরা। বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী ইবরাহিম খলিল জানান, মঙ্গলবার আকাশে বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার, যা বুধবার কমে ২৫ কিলোমিটার হয়। এ কারণে মুষলধারে বৃষ্টি হলেও উড়োজাহাজ চলাচল স্বাভাবিক ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত