উগ্রবাদ ও চরমপন্থা বরদাশত করব না

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৪ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার কোনো ধরনের উগ্রবাদ বা চরমপন্থা বরদাশত করবে না। তার বিশ^াস, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও উগ্রবাদ প্রতিরোধের প্রশ্নে সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। গতকাল বুধবার বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন এবং দ্বিতীয় সংসদ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। অধিবেশনের সমাপনী বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, প্রান্তিক কৃষক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। সরকার পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্রীড়া কার্ড, প্রবাসী কার্ড এবং ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য বিশেষ কার্ডসহ বিভিন্ন নাগরিক কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে একীভূত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্নে সব রাজনৈতিক শক্তিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি এবং বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা রোধে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যাতে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে সবুজ কর্মসংস্থান (গ্রিন এমপ্লয়মেন্ট) সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে কাজ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে, যার ফলে অবকাঠামো, সড়ক এবং জনসেবা খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, গত দেড় দশকে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে দেশ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে এবং পর্যাপ্ত জরুরি জ্বালানি মজুদও ছিল না। তিনি জানান, বর্তমান সরকার বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জ্বালানি মজুদ ৪৫ দিনের বেশি পর্যায়ে উন্নীত করেছে। ভবিষ্যতে তা ৯০ দিনের সমপরিমাণে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত, নির্যাতিত ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, নির্বাচনের আগে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারেক রহমান বলেন, সংসদ সদস্য ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, উগ্রবাদমুক্ত এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা যে বাংলাদেশে বিশ্বাস করি, সেখানে উগ্রবাদ কিংবা চরমপন্থার কোনো স্থান হবে না।’ সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও উগ্রবাদ প্রতিরোধের প্রশ্নে সবাই একসঙ্গে কাজ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী পূর্ববর্তী সরকারেরও সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট দেশ এবং বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার জন্য তারা দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে।

এর আগে প্রশ্নোত্তরপর্বে বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী। পিরোজপুর-৩ আসনের সদস্য রুহুল আমীন দুলালের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ স্বাধীনের পর যাদের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের একটি সঠিক ও নিরপেক্ষ পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করার দায়িত্ব ছিল, তারা সেই সময়ে তৈরি করেননি। বরং তালিকা তৈরি করতে গিয়ে তারা রাজনীতি টেনে এনেছেন। বর্তমান সরকার পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল বর্তমানে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। খুব স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের পবিত্র একটি দায়িত্ব রয়েছে। সেই কারণেই বর্তমান সরকার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির চেষ্টা করছে।

প্রাথমিক স্কুলে হবে প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ ফুটবল : ময়মনসিংহ-৮ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় ৫৪৫টি পার্ক ও খেলার মাঠ রয়েছে। সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ইনশা আল্লাহ আগামী বছর থেকে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ (ফুটবল) শুরু করতে যাচ্ছি। প্রাথমিক স্কুলে শুরু করে পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা মাধ্যমিক স্কুলেও নিয়ে যাব।

ঢাকা-৫ আসনের কামাল হোসেনের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো দুর্নীতি হলে এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার অবশ্যই হবে। একই সঙ্গে আমাদের সরকারের প্রচেষ্টা থাকবে পর্যায়ক্রমিকভাবে দুর্নীতিমুক্ত একটি পরিবেশ গড়ে তোলা।

কাতারের সাবেক আমিরের স্মরণে রাজধানীর একটি সড়কের নামকরণ : কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির স্মরণে রাজধানীর একটি উপযুক্ত সড়কের নামকরণের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের আনা কাতারের সাবেক আমিরের নামে ঢাকার একটি সড়কের নামকরণ করা সম্পর্কিত এক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে জানান, এই নির্দেশনা ইতিমধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে মৌখিকভাবে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সাবেক আমিরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, ‘মরহুম শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির প্রতি সম্মান দেখিয়ে কাতারের জনগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছি। কাতার এমন একটি দেশ যারা আমাদের উন্নয়ন কর্মকা-ে, দেশের অগ্রযাত্রায় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছে এবং এখনো করছে।’

শেষ হলো বাজেট অধিবেশন : সংসদ সচিবালয়ের জনসংযোগ অধিশাখা থেকে জানানো হয়, এই অধিবেশনে মোট ২৬টি কার্যদিবস হয়েছে। বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা ১৪টি কার্যদিবসে মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট স্থায়ী হয় যাতে ৩১৬ জন সংসদ-সদস্য অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া ১০টি সরকারি বিল পাস হয়েছে। কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধি অনুযায়ী ৭১৫টি নোটিসপ্রাপ্ত হয়; এর মধ্যে ২৪টি গৃহীত হয় এবং ২২টি নোটিসের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ৭১(ক) বিধি অনুযায়ী ১২৫টি দুই মিনিটের নোটিস আলোচিত হয়েছে। ১৩১ বিধি অনুযায়ী ৪টি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আলোচনা ও নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়ে যার মধ্যে ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য ৫,০৩১টি প্রশ্ন জমা পড়ে এবং ৩,৪৭৪টি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হয়েছে। এ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিসহ মোট ১১টি কমিটি গঠিত হয়েছে এবং কার্য উপদেষ্টা কমিটি পুনর্গঠিত হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত