‘জীবন আসলেই অন্যায্য।’
শেষ ১৬-র ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সামনে এটাই ছিল মিসরের অগ্নিবর্ষী কোচ হোসাম হাসানের প্রথম প্রতিক্রিয়া। কিংবদন্তি এই স্ট্রাইকার থেকে ম্যানেজার হওয়া হাসান ইতিহাসের অন্যতম সেরা অঘটন ঘটানোর মাত্র কয়েক মিনিট দূরত্বে ছিলেন। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে ফারাওরা ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শেষভাগে মাত্র ১৩ মিনিটে ৩ গোল করে রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা, যা মিসরের স্বপ্নযাত্রার নির্মম সমাপ্তি ঘটায়।
মিসরীয়দের জন্য এই ম্যাচটি ছিল আবেগের এক চরম রোলারকোস্টার প্রথমে জয়ের তীব্র আশা, তারপর হৃদয়ভঙ্গ এবং সবশেষে আর্জেন্টিনার পক্ষে যাওয়া রেফারিদের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে গণক্ষোভ। ম্যাচের সময় হাসান ফিফার বর্ণবাদবিরোধী প্রতীক ইংরেজি এক্স চিহ্নের মতো করে হাত উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানান এবং ম্যাচ শেষে সরাসরি অভিযোগ করেন যে, ফিফা চায় আর্জেন্টিনাই জিতুক। হাসানের দাবি ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার সময় ১০০ গজ দূরে হওয়া একটি ফাউলের জন্য ভিএআর রিভিউ করে মিসরের বৈধ দ্বিতীয় গোলটি বাতিল করা হয় এবং এনজো ফার্নান্দেস আর্জেন্টিনার জয়সূচক তৃতীয় গোলটি করার ঠিক আগে মিসরকে একটি পেনাল্টি দেওয়া উচিত ছিল। ম্যাচ শেষে হাসান বলেন, ‘হয়তো তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল? হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি যেন রেস থেকে ছিটকে না যান!’
কোচ হাসানের এই বিস্ফোরক মন্তব্য পুরো মিসরে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া ল্যাটেক্সিয়ার বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার মুখে পড়েন। মিসরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেতে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে নোটিস দেওয়া হয়। এমনকি ইন্টারনেটে তার উইকিপিডিয়া পেজটি হ্যাক করে তাকে ইহুদি হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা ভক্তদের মধ্যে এক জায়নবাদী ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ছড়ায়; কারণ টুর্নামেন্ট জুড়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে হাসান ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার।
আর্জেন্টিনা যত এগিয়েছে, এই ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন ততই তাদের পিছু নিয়েছে। এর মধ্যে যোগ হয় আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি অর্থপাচারের অভিযোগে এফবিআই-এর তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার খবর। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের প্রধান স্ট্রাইকারকে বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তে লাল কার্ড দেওয়া হলে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ আরও জোরালো হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাখ লাখ লাইক পাওয়া পোস্টে লেখা হতে থাকে, ‘৩০০০ বছর আগেই বিশ্বকাপটি মেসির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল’ কিংবা ‘সবকিছু মেসির জন্য পাতানো।’ এমনকি ফিফার কাছে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করার দাবিতে ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি ভক্ত একটি অনলাইন আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। এবারের বিশ্বকাপের প্রায় প্রতিটি বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভিএআর প্রযুক্তি। সমালোচকদের মতে, এর ব্যবহার পক্ষপাতদুষ্ট এবং মূল উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে এটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। যেমন পর্তুগালের বিরুদ্ধে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার একটি গোল বলের ভেতরের সেন্সরে সামান্য অফসাইড ধরা পড়ায় বাতিল হয়, যা খালি চোখে বোঝাই অসম্ভব ছিল।
তবে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি ঘটে যখন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড ও এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে ফিফা বাতিল করে দেয়। ট্রাম্প পরে এই নিয়ে বড়াইও করেন। ফিফা যেখানে আগে বলেছিল লাল কার্ডের বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলে না, সেখানে স্বাগতিক দেশের প্রেসিডেন্টের চাপে ফিফার এই অবস্থান পরিবর্তন টুর্নামেন্টের সততা ও নিরপেক্ষতাকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেয়। উয়েফা এই সিদ্ধান্তকে ‘নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য এবং অসমর্থনযোগ্য’ বলে নিন্দা জানায়। অন্যদিকে ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গের দায়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি-কে তদন্তের অনুরোধ করা হয়েছে। এর আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞাও একইভাবে শিথিল করেছিল ফিফা। সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-জেনারেটেড ভুয়া ছবি ও ভিডিওর বন্যা পরিস্থিতিকে আরও বিষাক্ত করে তুলেছে। হিটলারের মতো দেখতে এক ব্যক্তির জার্মানির গোল উদযাপন, বিদায়ী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ক্রোয়েশিয়ার জার্সি পরা ছবি, কিংবা মার্কিন বিমান হামলায় নিহত ১৬৮ জন ইরানি স্কুলছাত্রীর স্মরণে এক ইরানি ফুটবলারের পিংক ব্যাকপ্যাক ধরে রাখার মতো ভুয়া ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
মিসরের এই বিশ্বকাপ যাত্রা ছিল গত ১৫ বছরের মধ্যে দেশটির মানুষের জন্য এক যৌথ আনন্দের উপলক্ষ। আরব বিশ্ব ও আফ্রিকার কোটি কোটি শোষিত মানুষের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল এই দল। হাসান ম্যাচ জিতে ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়েছিলেন। কিন্তু বিতর্কিত রেফারিংয়ের কাছে যখন মিসরের এই স্বপ্ন ভেঙে গেল, তখন সেই কষ্ট শুধু ফুটবলের হারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বছরের পর বছর অবিচারের শিকার হওয়া মানুষের কাছে এটি মনে হয়েছে আরও একটি নির্মম অনুস্মারক যে জগতের নিয়মগুলো সবার জন্য সমান নয়।
ম্যাচ শেষে মিসরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে জানায় যে, তারা এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘চুপ থাকতে পারে না’। এর পরপরই আর্জেন্টিনার ফেডারেশনের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে কিছু ভুয়া মেইল পাঠানো হয়, যেখানে ফিক্সিংয়ের কথা স্বীকার করা হয়। ফলে ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টিনা রাতারাতি এক ‘ভিলেন’-এ পরিণত হয়।
আসলে বিশ্বকাপ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। ফুটবল হলো সমাজেরই একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে জন্ম নেওয়া ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো মূলত বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বিভাজনেরই বহিঃপ্রকাশ। কিউঅ্যানন আন্দোলন, ভ্যাকসিন-বিরোধী প্রচার বা বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বর্ণবাদের মতোই এই ক্ষোভগুলো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এসে আলোর নিচে উন্মোচিত হয়েছে। বিশ্বকে বোঝার জন্য ফুটবল আজ এক বিশালাকার আয়নায় রূপ নিয়েছে।