আর মাত্র পাঁচ মিনিট। ইংল্যান্ড যদি শেষের এতটুকু সময় সামলে নিত, তাহলে গল্পটা অন্যরকম হতে পারত। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ৫৯ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার উৎসবে ভাসত ইংলিশরা। হ্যারি কেইনকে নিয়ে লেখা হতো নতুন এক মহাকাব্য। কিন্তু ফুটবল কখনো নির্মম চিত্রনাট্য নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। ঠিক তখনই এনজো ফার্নান্দেজের সমতাসূচক গোল। এরপর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের হেড। মুহূর্তেই ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সেই সঙ্গে নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে কেইনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
সেদিন ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় কথা বলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। কিন্তু সেই শান্ত কণ্ঠেই স্পষ্ট ছিল ক্লান্তি আর হতাশার ভার, ‘আমরা খুব কাছাকাছি ছিলাম। আরেকটি ফাইনাল থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট ছিল না। গত সাত সপ্তাহে আমরা সর্বস্ব দিয়েছি, তাই এভাবে থেমে যাওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। আট বছর ধরে আমরা দরজায় কড়া নাড়ছি, তবে শেষ ধাপটা পার করতে পারছি না।’ দুই সপ্তাহ পর ৩৩ বছরে পা দেবেন কেইন। পরের বিশ্বকাপ যখন মাঠে গড়াবে, তখন ৩৭ ছুঁয়ে ফেলবেন তিনি। ফলে প্রশ্নটা এখন আর নিছক জল্পনা নয়। এটাই কি তার শেষ বিশ্বকাপ ছিল? সেটা হয়ে থাকলে বিশ্বকাপে নিজের শেষ ম্যাচটি আর্জেন্টিনার বিপক্ষেই খেলে ফেলেছেন তিনি। সুযোগ থাকলেও ফ্রান্সের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মাঠে নামেননি। ডাগআউটে বসে সতীর্থদের উৎসাহ দিতে দেখা যায় তাকে। কেইনকে ছাড়া ম্যাচটি ইংল্যান্ড জিতলেও হৃদয়ভাঙার ক্ষত নিয়েই মাঠে নামেন ইংলিশ ফুটবলাররা।
শেষ চারে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম এক ঘণ্টা দাপটের সঙ্গে খেলেছিল ইংল্যান্ড। ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল, ফাইনালের দরজা খুলে গেছে। কিন্তু এরপর টমাস টুখেলের দল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। কেইনের নিজের পারফরম্যান্সও প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি। পুরো ম্যাচে বল স্পর্শ করেন মাত্র ২৬ বার, সফল পাস মাত্র ৯টি। গোলমুখে একটিমাত্র শট নিলেও সেটি ব্লক হয়ে যায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, পুরো ৯০ মিনিটে একবারও আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে বল স্পর্শ করতে পারেননি ইংল্যান্ড অধিনায়ক। দ্বিতীয়ার্ধে যখন দলের সত্যিকারের একজন স্ট্রাইকারের প্রয়োজন ছিল, তখন বারবার নিচে নেমে আসা কেইনকে আর কার্যকর মনে হয়নি।
এই হার শুধু ইংল্যান্ডের স্বপ্নই ভাঙেনি, ভেঙে দিয়েছে বায়ার্ন মিউনিখের ৪০ বছরের এক ইতিহাসও। ১৯৮২ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপের ফাইনালে বায়ার্নের অন্তত একজন খেলোয়াড় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এবার ইংল্যান্ড দলে বায়ার্নের একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন কেইন। তার বিদায়ের সঙ্গে থেমে যায় ১১টি বিশ্বকাপজুড়ে চলা সেই ধারাবাহিকতা। কেইনের জন্য এই ব্যর্থতা আরও তিক্ত। ক্লাব ফুটবলে সর্বশেষ মৌসুমে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটান তিনি। বায়ার্নের জার্সিতে বুন্দেসলিগায় একাই করেন ৩৬ গোল। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে করেন ৫৮ গোল। বায়ার্নের ইতিহাসে দ্রুততম খেলোয়াড় হিসেবে গড়েন ১০০ গোলে অবদানের রেকর্ড। দলটির হয়ে লিগ শিরোপা জয়ে বড় অবদান ছিল কেইনের। এটাই তার ক্যারিয়ারের প্রথম এবং এখনো পর্যন্ত একমাত্র বড় কোনো শিরোপা। এই কারণেই তিনি বিশ্বকাপের আগে ব্যালন ডি’অর নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। জানিয়েছিলেন, এই মৌসুমের অর্জন তাকে পুরস্কারের দৌড়ে রাখবেই, বিশেষ করে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জিতলে তো কথাই নেই।
টুর্নামেন্টের প্রথম পাঁচ ম্যাচে সেই দাবির সপক্ষে প্রমাণ রাখেন কেইন। ছয় গোল করে জুড বেলিংহামের সঙ্গে যৌথভাবে ছিলেন ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও মেসি-এমবাপ্পের কাছাকাছি ছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের পর সেটি ভেঙে গেছে। একই সঙ্গে কেইনকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত টিকে থাকবেন? সরাসরি উত্তর দেননি ইংল্যান্ড অধিনায়ক, ‘এখনই কিছু বলা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। আমি বছর ধরে এগোই, দেখি নিজেকে কেমন লাগে। ইংল্যান্ডের হয়ে খেলতে ভীষণ ভালোবাসি, কিন্তু চার বছর সত্যিই দীর্ঘ সময়। আবার মেসির মতো কাউকে দেখুন, বয়স বাড়ার পরও সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলছেন। সত্যি বলতে, এখন কিছুই জানি না। এই মুহূর্তে বিদায়টা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’