প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেশের দক্ষিণের দ্বীপজেলা ভোলা। জেলার মাটির নিচে রয়েছে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই সম্পদকে ঘিরে শিল্পায়নের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন ভোলাবাসী, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নেয়নি। গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে এবং আবাসিক কিছু সংযোগে সরবরাহও হচ্ছে; তবে গ্যাসভিত্তিক বড় শিল্প, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার গ্যাস শুধু এই জেলার নয়, দেশের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবহার ও দ্রুত শিল্পায়নের উদ্যোগ।
আবিষ্কারের তিন দশক : ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। এ গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০০৯ সালে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। বর্তমানে এ ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।
সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে বর্তমানে ভোলার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় ২ হাজার ৩৪৪টি ননমিটার ও ৩১টি মিটারের মাধ্যমে আবাসিক সংযোগে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন সরবরাহের পরও প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উদ্বৃত্ত থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর পাশাপাশি ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে ইলিশা-১ নামে আরও দুটি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেলেও এখনো সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন শুরু হয়নি।
তবু থেমে আছে শিল্পের চাকা : জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে ভোলা এখনো সংযুক্ত না হওয়ায় জেলার উৎপাদিত গ্যাসের একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস অব্যবহৃত থাকে। এ গ্যাসের একটি অংশ ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন পিএলসির মাধ্যমে সংকুচিত (সিএনজি) করে বিশেষ ক্যাসকেড সিলিন্ডারবাহী ট্রাকে কার্গো ফেরির মাধ্যমে ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে দূরবর্তী এলাকায় গ্যাস পরিবহনের পরিবর্তে ভোলাতেই গ্যাসভিত্তিক শিল্প-কারখানা, সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প স্থাপন করা হলে তা অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভজনক হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ভোলার সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে।
ভোলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে, জেলার গ্যাস স্থানীয় শিল্পায়নে ব্যবহার করা হোক। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে সার কারখানা, ইপিজেড, এলএনজি স্টেশন এবং জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সংযুক্ত করার কথা বলা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। স্থানীয়দের মতে, গ্যাস সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ভোলায় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় শিক্ষিত ও দক্ষ অনেক তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য অন্য জেলায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
ভোলা জেলা ক্যাবের সভাপতি মো. সুলাইমান বলেন, ‘গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে এখানে শিল্প স্থাপন করা গেলে শুধু ভোলার মানুষের নয়, দেশের অর্থনীতিরও উপকার হবে। আমরা চাই ঘোষণাগুলো যেন বাস্তবে রূপ নেয়।’
শিল্পপার্কের ঘোষণায় নতুন স্বপ্ন : দীর্ঘদিনের স্থবিরতার মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যকে ঘিরে। ভোলায় শিল্পপার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি জেলার প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদকে স্থানীয় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার এই ঘোষণার পর ভোলার ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, অতীতের মতো শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভোলার শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
সাংবাদিক ইকরামুল আলম বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ভোলার মানুষ শুধু আশ্বাস শুনেছে। বিভিন্ন সময়ে অনেকেই এসে সম্ভাবনা দেখে গেছেন, কিন্তু বাস্তব কাজ খুব বেশি এগোয়নি। এবার মানুষ ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখতে চায়।’ উত্তর রতনপুর দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মো. আব্দুর রহমান হেলালের মতে, ভোলার গ্যাস শুধু একটি জ¦ালানিসম্পদ নয়, এটি জেলার অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম হাতিয়ার। তিনি বলেন সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন সমন্বিত উদ্যোগ নিলে ভোলায় শিল্পায়নের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, ‘ভোলায় শিল্পপার্ক স্থাপনের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। সরকারি সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর জমিসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’
গ্যাস অন্যত্র নয়, আগে ভোলার উন্নয়নে ব্যবহারের দাবি : ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এখানকার গ্যাস অন্য অঞ্চলে নেওয়ার আগে স্থানীয় শিল্পায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ভোলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ‘ভোলার গ্যাস অন্যত্র নিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। সেই অর্থ দিয়ে যদি ভোলাতেই শিল্প গড়ে তোলা যায়, তাহলে দেশ ও ভোলা দুই জায়গাই লাভবান হবে।’ তিনি বলেন, ‘গ্যাসের মূল্য ও ব্যবহারের পরিকল্পনা নতুন করে বিবেচনা করলে ভোলায় শিল্প স্থাপন করা সম্ভব।’
ভোলা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রাইসুল আলম বলেন, ‘ভোলার গ্যাস সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এতে বেকারত্ব কমবে এবং জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে।’ ভোলা জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সদস্য সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান বলেন, ‘ভোলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনেক পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন হয়নি। এখন নতুন করে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন হলে ভোলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে।’
ভোলা সুন্দরবন কর্মকর্তা যা বললেন : ভোলা সুন্দরবন গ্যাস ফিল্ড কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) মো. অলিউল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমানে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে। সরকার এ কার্যক্রম পুনরায় চালু করলে আমরাও নতুন সংযোগ দেওয়া শুরু করব। তবে শিল্প কারখানার জন্য গ্যাস সংযোগ কার্যক্রম চালু রয়েছে। কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগের আবেদন করলে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত সংযোগ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিল্প খাতে গ্যাস সংযোগ দিতে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছি।’
ইনসেটে ব্যবহার করা যাবে
একনজরে ভোলার গ্যাস
** আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র : শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা
** শাহবাজপুর গ্যাস আবিষ্কারের সূচনা : ১৯৯৫ সালে
** ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্র : ২০১৮ সালে
** ইলিশা-১ গ্যাসক্ষেত্র : ২০২৩ সালে
** ভোলা নর্থ ও ইলিশা-১ গ্যাসক্ষেত্র থেকে এখনো বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়নি
** শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র উত্তোলন শুরু : ২০০৯ সালে
** শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রে মজুদ : প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট
** প্রতিদিন উত্তোলন : প্রায় ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট
** প্রধান ব্যবহার : দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৭টি শিল্প-কারখানা এবং প্রায় ২,৩৪৪টি আবাসিক সংযোগে সরবরাহ
** সম্ভাবনা : গ্যাসভিত্তিক শিল্প, সার কারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, নতুন কর্মসংস্থান
ছবি : ভোলা শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র