দুই হাজার সালের গোড়ার দিকের ঘটনা। ঢাকা ক্লাবের প্রধান ফটকের পাশে ফুলটি দেখে ভেবেছিলাম ভিনদেশি। কিন্তু বই-পুস্তক ঘেঁটে দেখি গাছটির আদি আবাস বাংলাদেশ-ভারত। দেশের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো স্থানের মধ্যে ঢাকার কথাও আছে। তথ্য এটুকুই। তারপর থেকে চোখ-কান খোলা। বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করি। অবশেষে প্রায় এক যুগ পরে তার সন্ধান পাওয়া গেল।
প্রথম দফায় কাক্সিক্ষত স্থানে পাওয়া গেল না। কয়েক বছর ধরে বর্ষায় সেখানে গিয়ে হতাশ হয়েছি। অথচ আগের বছরগুলোতে সেখানেই ছিল গাছটি। এমনও হতে পারে, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কন্দ মূলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকবার পর্যবেক্ষণ করেও দেখা মিলল না গাছটির। অবশেষে কয়েক বছর আগে বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগায় কিছু মৌসুমী উদ্ভিদ খুঁজতে গিয়েই এই রূপসী ফুলের দেখা পাই। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো উলটচণ্ডালের ফুল প্রথম দেখা। আহা কী আনন্দ! কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আনন্দ উবে গিয়ে শঙ্কা দানা বাঁধে, আগামীর দিনগুলোতে কী গাছটির আবাসস্থল সংরক্ষিত থাকবে?
আমাদের দেশে এমন অনেক উদ্ভিদই প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়ে নগর উদ্যানে আশ্রয় নিয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে স্বল্পতার কারণে কেউ কেউ ওদের আবার ভিনদেশিও ভাবতে শুরু করেছে। কারণ প্রকৃতিতে এখন আর ওদের কোনো অস্তিত্ব নেই। অবশ্য উলটচণ্ডালের ক্ষেত্রে তা কিছুটা ব্যতিক্রম। ফুলটি Gloriosa superba) একেবারেই সংক্ষিপ্ততম সময়ের অতিথি হয়ে আসে প্রকৃতিতে। ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রাঙ্গণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বাগান ও বলধা গার্ডেনসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে চোখে পড়ে। তবে প্রাকৃতিকভাবে দুষ্প্রাপ্য। গাছটির মূল ও পাতাকে যে পরিমাণ বিষাক্ত মনে করা হয়, আদতে পরিমাণটা সেরকম কিছু নয়, জীবাণুনাশক গুণটাই মুখ্য। বরং চমৎকার ওষুধিগুণের জন্য ব্যাপক আদৃত। বাংলার বনফুল গ্রন্থে নওয়াজেশ আহমদ জানিয়েছেন গর্ভপাত, ক্রিমির উপদ্রব, কুষ্ঠরোগ, সাপ ও বিছার বিষ ইত্যাদি নির্মুলে মূল ব্যবহৃত হয়; এ কারণেই আরেক নাম বিষলাঙুলি। পাতার রস উকুন নাশক।
মধুপুর বন ও উপকূলীয় অঞ্চলে জন্মে। গাছ লতান, পাতার আগা আকষীতে রূপান্তরিত, তা দিয়েই আশ্রয় বেয়ে ওঠে। পাতা লম্বা, বোঁটাহীন, বিন্যাস বিপ্রতীপ। ফুল গ্রীষ্মের শেষে ও বর্ষায়, ফোটে কাক্ষিক মঞ্জরিতে, এক বা একাধিক, গন্ধহীন, প্রথমে হলুদ, পরে কমলা ও লাল, পাপড়ি ৬, উপরের দিকে উলটান, কিনার কুঁচকান, ৬ সেমি লম্বা। শরতে শুকিয়ে শীতে মরে যায়, গ্রীষ্মে আবার গুচ্ছমূল থেকে নতুন চারা গজায়। আইইউসিএন এর তথ্য মতে গাছটি বর্তমানে বিপন্নপ্রায়।
লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক