মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৮ উইকেটের পরাজয়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্নে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যাচ মিস, ব্যাটিংয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে না পারা এবং স্পিনারদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা মিলিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়েছে স্বাগতিকদের। তবে এই ব্যর্থতার পেছনে মিরপুরের উইকেটের চরিত্রকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। তার মতে, গত প্রায় এক বছর স্পোর্টিং উইকেটে ভালো খেলার পর হঠাৎ স্পিননির্ভর কন্ডিশনে এসে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হয়েছে।
প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২৪৫ রানে অলআউট করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ২৭ রানের লিড পাওয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ ছিল নাজমুল হোসেন শান্তদের সামনে। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৪২ রানে গুটিয়ে গিয়ে প্রতিপক্ষের সামনে লক্ষ্য দাঁড় করায় ১৭০ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই উইকেট হারিয়েই সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায়। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে বাংলাদেশের কয়েকটি সিদ্ধান্ত, আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত এবং ফিল্ডিংয়ের ভুল ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন আশরাফুল।
ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে ঘরের মাঠে টেস্ট হারা হতাশাজনক বলে দাবি করেন বাংলাদেশ দলের সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, ‘মিরপুর টেস্ট আমরা যেভাবে খেলেছি, সেটা অবশ্যই হতাশার। এত চমৎকার টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, আমরা খুব ভালো পজিশনে ছিলাম। এই টেস্ট ম্যাচে কয়েকটি সিদ্ধান্ত, আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত এবং অনেকগুলো ক্যাচ মিস আমাদের বিপক্ষে গেছে।’ প্রথম ইনিংসে রস্টন চেজ ও জন ক্যাম্পবেলের ক্যাচ মিসকে ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন আশরাফুল, ‘প্রথম ইনিংসে চেজের ২৯ রানে ক্যাচ নিতে পারলে, ক্যাম্পবেলের ৫ রানে ক্যাচ নিতে পারলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতো। প্রথম ইনিংসে অন্তত ৯০ রানের লিড পেতে পারত। তখন আবার ডিফারেন্ট বল গেম হতো।’ সঙ্গে যোগ করেন তিনি, ‘ক্যাচ ড্রপ হতেই পারে, কিন্তু আপনি যখন টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলতে চাইছেন, তখন এ ধরনের ক্যাচ ছেড়ে দিলে রেজাল্ট পাওয়াটা কঠিন হয়ে যায়।’
প্রথম ইনিংসে সাদমান ইসলামের সেঞ্চুরি এবং তৌহিদ হৃদয় ও লিটন দাসের কার্যকর ব্যাটিং বাংলাদেশকে লড়াইয়ে রাখে। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি ব্যাটসম্যানরা। মাত্র ১৪২ রানে অলআউট হওয়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে জয়ের পথ সহজ হয়ে যায়। আশরাফুল মনে করেন, ব্যাটসম্যানদের সামনে বড় সংগ্রহ গড়ার সুযোগ ছিল। চার শ রানের ইনিংস খেলতে পারলে ম্যাচের ফল বাংলাদেশের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকত। তার মতে, ব্যাটিংয়ে বড় ইনিংসের অভাব এবং ফিল্ডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়া, এই দুই বিষয় একসঙ্গে বাংলাদেশের বিপক্ষে কাজ করেছে।
তবে এসব ছাপিয়ে উইকেটকেই বেশি দায়ী করলেন আশরাফুল। তার মতে, গত এক বছর মিরপুরে স্পোর্টিং উইকেটে খেলার পর হঠাৎ স্পিননির্ভর কন্ডিশনে এসে ব্যাটসম্যানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে। বল নিচু হবে, স্পিন করবে, নাকি স্বাভাবিক থাকবে, এসব চিন্তা ব্যাটিংয়ের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলে। জাতীয় দলের সদ্য বিদায়ী এই ব্যাটিং কোচ বলেন, ‘কিন্তু ব্যাটিংটা আসলে এত সহজ নয়। অন্য দুই স্কিলের তুলনায় ব্যাটিং অনেক কঠিন। আপনি এক বলে আউট হয়ে গেলে শেষ, ঠিক না? ভালো উইকেটে ব্যাটিং করে এসে হঠাৎ যখন মাথায় ঢুকে যায় যে স্পিন হবে, বল লো হবে বা কিছু একটা হবে, তখন ডিসিশন মেকিং করাটা ডিফিকাল্ট।’
আশরাফুলের মতে, গত এক বছরে ঘরের মাঠে স্পোর্টিং উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান, পেসার ও স্পিনাররা ভালো পারফরম্যান্স করেছেন। কিন্তু এবারের ম্যাচে স্পিনারদের ওপর দায়িত্ব ছিল বেশি, যা তারা পূরণ করতে পারেননি। এর দায় মেটাতে হয়েছে ম্যাচ হারের মধ্য দিয়ে। আশরাফুলের দাবি, ‘এটা একটা বড় সমস্যা। আমার মনে হয়, এই জায়গাটা আমাদের ব্যাকফায়ার করেছে। কারণ গত এক বছর যদি দেখেন, আমরা ঘরের মাঠে স্পোর্টিং উইকেটে খেলেছি। সেখানে স্পিনাররা ভালো করছিল, পেসাররা ভালো করছিল, ব্যাটসম্যানরাও ভালো করছিল। সবাই নিজের ছাপ রাখছিল। কিন্তু এবার দায়িত্ব ছিল স্পিনাররা, যেটা তারা পারেনি।’ প্রতিপক্ষ দলে মানসম্পন্ন স্পিনার থাকলে উল্টো বিপদে পড়তে হয় বলেই মনে করেন তিনি, ‘আমাদের ২৬ বছরের ক্রিকেট ইতিহাস দেখেন, যখনই স্পিন উইকেট বা এ ধরনের উইকেট বানানো হয় এবং প্রতিপক্ষ দলে মানসম্পন্ন স্পিনার থাকে, তখন আমরা ফেল করি। আমরা যখন খেলেছি, আমাদের সময়েও একই হয়েছে। একটু যদি কোয়ালিটি স্পিনার থাকে, তখন তারাই সুবিধা কাজে লাগায়।’