মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের সাম্প্রতিক আন্দোলনে সহিংস কর্মকা-ে অর্থায়নের অভিযোগে শতাধিক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে ১২৫ প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের হিসাব চেয়ে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক কর্মী ও তাদের দোসর এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। গতকাল বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত চিঠির সফট কপি ই-মেইলে এবং হার্ডকপি জরুরি ডাকযোগে ব্যাংকগুলোতে পাঠানোর দাবি করেছেন এনবিআরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
তবে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও একটি বেসরকারি ব্যাংকে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্টরা জানান, তারা (গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) কোনো চিঠি পাননি। দুটি ব্যাংকের কর্মকর্তা পৃথকভাবে বলেছেন রবিবার নাগাদ চিঠির বিষয় নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এনবিআরের ওই কর্মকর্তা বলেন, ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় সফট ও হার্ড কপি এ দুভাবেই ব্যাংকগুলোতে পাঠানো হয়েছে। না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) থেকে ওই চিঠি পাঠানো হয়।
গত মঙ্গলবার এনবিআরের অভ্যন্তরীণ এক অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, বিশেষ একটি কারণে আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪ পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করছে। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বক্তব্য-বিবৃতিতে দাবি করেন, শ্রমিকদের সাম্প্র্রতিক আন্দোলনে সহিংস কার্যক্রম ঘটাতে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠরা অর্থায়ন করেছেন।
পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম বিদেশে বসে এই অর্থের জোগান ও নির্দেশনা দিচ্ছেন। ঢাকায় তাদের হয়ে লোক সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লা ও জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল। এর বাইরে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতা হয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলোচিত দেশের শীর্ষ ১২ ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিক এ আন্দোলনে নাশকতামূলক কর্মকা-ের জন্য অর্থায়ন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্যাংকগুলোকে দেওয়া এনবিআরের চিঠিতে তালিকায় রয়েছেন সি-পাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি (কারাবন্দি), সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান। তালিকায় আরও রয়েছেন ফেবিয়ান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, রেনেসাঁ গ্রুপের মালিক ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম; হামিদ গ্রুপের মালিক এবং সাবেক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু; এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালাম, নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী, অ্যাক্সিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলু, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম মোশাররফ হোসেন, গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুমা খাতুন লিপা।
এদের কারও কারও ব্যাংক হিসাব ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুদকসহ একাধিক সংস্থার মামলায় জব্দ করা হয়। কেউ কেউ কারাগারে আছেন এবং অনেকে দেশের বাইরে। অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার কথা চিঠিতে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, তার ভাগ্নে আলিফ মোল্লা, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম ও তার সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল, স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মী কামাল গাজী ও শুভ নামে এক ব্যক্তি।
আন্দোলনে নাশকতা সৃষ্টিতে বাহাউদ্দিন নাছিম অনলাইনে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন বলে দাবি করেছে একটি সূত্র। তার নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫টি হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ফেসবুক পেজে আন্দোলনের বিভিন্ন স্থানের ভিডিও, ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন প্রায় ১৫০ ব্যক্তি। পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত সরকারের কাছে এমন তথ্যপ্রমাণ আছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার খুলনার এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সীমান্তের ওপার থেকে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান অপর এক জনসভায় অভিযোগ করে বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীরা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছেন।
উল্লেখ্য, চব্বিশের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখান থেকে প্রায়ই তার নানা বক্তব্য-বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসবেন। নেতাকর্মীদের তিনি প্রস্তুত থাকতেও নির্দেশ দিয়েছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীদের তৎপরতা না থাকলেও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর তারা তৎপর হয়েছেন।