সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে রাজপথে বড় আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ভাবছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট। আন্দোলনকে পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে রাজপথে শক্ত কর্মসূচি দেওয়া ছাড়াও সংসদ বর্জনের মতো কর্মসূচি দেওয়ার কথাও ভাবছেন নেতারা। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১৫ সদস্যের একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করতে যাচ্ছে জোট। শিগগির আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে কমিটি ঘোষণা করা হবে। সংবিধান সংশোধনে সরকার গঠিত বিশেষ কমিটি প্রথম থেকেই বর্জন করে আসছে বিরোধীরা। ১১ দলীয় জোট বলছে, গণভোটের রায়ের আলোকেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, চলমান লংমার্চ কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগেই আসতে পারে বৃহৎ আন্দোলন কর্মসূচি। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
জোট নেতারা বলছেন, সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার সুযোগ নেই। জুলাই জাতীয় সনদে যে প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে এবং গণভোটে যে রায় এসেছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংসদীয় বিশেষ কমিটির উদ্যোগকে তারা যথাযথ প্রক্রিয়া বলে মনে করছেন না। তাদের দাবি, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও কার্যকর করেই সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের সময় সরকার আমাদের দাওয়াত দিয়েছিল। তখন আমরা জোটের একটি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমরা এই কার্যক্রমে অংশ নেব না। এরপর আমাদের দাবি আদায়ে নিয়মিত কর্মসূচি চলমান রয়েছে। আগামী সপ্তাহে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখান থেকে আলোচনার ভিত্তিতে নতুন কর্মসূচি আসতে পারে।
এদিকে, সরকার সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায়। গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১৭ সদস্যের কমিটির জন্য বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজনের নাম না পাওয়ায় কমিটি ১২ সদস্য নিয়ে কাজ করছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিরোধীরা নাম দিলে কমিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের এই উদ্যোগের বিপরীতে ১১ দলীয় জোট ১৫ সদস্যের স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করেছে। এতে জোটের রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদেরও যুক্ত করা হয়েছে। কমিটির উল্লেখযোগ্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির এবং জুলাই শহীদ ক্লাবের ইব্রাহিম মুসা। কমিটির বাকি সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিগগির জোটের এমপিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন হবে। যে কমিটি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই গণদাবির সঙ্গে যুক্ত করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চলমান লংমার্চ ছাড়াও ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। জোটের বৈঠকে আলাপ-আলোচনা করে এই মহাসমাবেশের তারিখ চূড়ান্ত করা হতে পারে।
জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, কমিটির মাধ্যমে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনার আয়োজন করা হবে। সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে। আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও আলোচনায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। বিরোধী দলের সদস্যরা দুই দফা শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সাংবিধানিক বিরোধের মূল জায়াগা এটি।
জোটের নেতারা বলছেন, শুধু আলোচনা বা বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা সম্ভব হবে না। তাই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে কর্মসূচির ধরন পরিবর্তন এবং রাজপথে বড় সমাবেশের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। জোটের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসদ বর্জনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কর্মসূচির ধরন ও সময় নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সরকার সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোট গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানাচ্ছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু সংবিধানের কিছু ধারা সংশোধনের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, গণভোটের রায়ের ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন। এই বিরোধ কোন পথে এগোয়, তার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও।
জামায়তে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের লংমার্চগুলোতে মানুষের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। এই সাত দফা দাবি এখন আর ১১ দলের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জনদাবিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের আরও লংমার্চের পরিকল্পনা রয়েছে, ঢাকায় মহাসমাবেশের কথা রয়েছে। জোটের শীর্ষ নেতারা বসে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করবেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ গ্রহণ করা হয়। পরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দেন। বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান ছিল। বিএনপির সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্যরা উভয় শপথ নেন। বিএনপি সরকার বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার পক্ষে। সরকার ইতিমধ্যেই সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করে রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপনের লক্ষ রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিল তৈরির কাজ করবে। তবে বিরোধীরা কমিটির কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে না।
এদিকে, সরকারের গঠিত কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়নি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এমনকি বৈঠকগুলো জামায়াত, এনসিপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের অধিকাংশ দল বর্জন করেছে। গত মঙ্গলবার সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির বৈঠকে ছাত্রদল অংশ নিলেও তা বর্জন করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তি, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েমসহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদের নেতারাও বৈঠকে যোগ দেননি। তাদের দাবি, সংবিধান সংশোধন নয়, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে।
ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ অভিযোগ করেন, গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় উপেক্ষা করে সরকার একদলীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক তাহমীদ আল মুদ্দাসসীর চৌধুরী যৌথ বিবৃতিতে কমিটিকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, গণভোটে মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দেওয়ার পর সংশোধন কমিটি গঠনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা কমিটি বাতিল করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানান। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকার অভিযোগ তুলে বৈঠক বর্জন করেছে।