কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তৈরি করছেন নানা উদ্ভাবনী সেবা। গরু পালনের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে আইনি সেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করতে তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। এসব উদ্ভাবন তুলে ধরা হয়েছে দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬-এ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে দেশি-বিদেশি ১২৪টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বাণিজ্যিক ব্যবহার, দেশীয় উদ্ভাবন এবং এ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরতে এ আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান আয়োজকরা।
সম্মেলনে ‘এআই বিজনেস এক্সপো’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে বিভিন্ন উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীর তৈরি উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আইওটি প্রযুক্তিনির্ভর ‘গরু সেবা’, আইনি সেবা সহজ করতে ‘উকিল ডট কম’, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রিসেপশনিস্টের বিকল্প হিসেবে এআই রোবট এবং বর্জ্য আলাদা করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করতে এআইনির্ভর ‘স্মার্ট ডাস্টবিন’। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তুলে ধরছেন তরুণ উদ্ভাবকরা।
গরু সেবা : তরুণ উদ্যোক্তা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রাফিউল হাসান রোহানের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ‘গরু সেবা’। মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ডিভাইস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সমন্বয়ে তৈরি এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গরুর স্বাস্থ্য, ওজন, অবস্থান ও চলাফেরার তথ্য জানা যাবে। ছবি বিশ্লেষণ করে গরুর আনুমানিক ওজন নির্ধারণের পাশাপাশি গলায় পরানো বিশেষ কালারের মাধ্যমে জিপিএস প্রযুক্তিতে গরুর অবস্থান ও শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
প্ল্যাটফর্মটিতে ‘মতি মিয়া’ নামে এআই ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট রয়েছে, যার মাধ্যমে গরু পালন ও খামারব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ পাওয়া যাবে। এ ছাড়া খামারের সম্ভাব্য লাভ-লোকসান, খাবারের পরিকল্পনা ও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য রয়েছে ‘দর-দর্শী’ টুল। অ্যাপ থেকেই পশুচিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ, খামারের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা এবং গরুর জীবন বীমা সুবিধা নেওয়া যাবে। বাংলা ভাষায় ব্যবহারের উপযোগী এই প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ২৫ জন খামারি যুক্ত রয়েছেন। তাদের খামারে প্রায় ২৫০টি গরু রয়েছে। উদ্যোক্তার দাবি, প্রযুক্তিটির ব্যবহারে খামারের উৎপাদনশীলতা ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো এবং খরচ কমানো সম্ভব। প্ল্যাটফর্মটির ওয়েবসাইট মড়ৎঁ.ফরমরঃধষ এবং গুগল প্লে স্টোরে ‘গরু সেবা’ নামে অ্যাপটি পাওয়া যাবে।
উদ্যোগটি সম্পর্কে রোহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গরু সেবা একটি ফার্মিং ইকোসিস্টেম, যার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের খামারি থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ও শিল্প পর্যায়ের খামারিদের সহায়তা করা হয়। এক-দুটি গরু পালনকারী থেকে শুরু করে বড় খামারি, সব ধরনের খামারির জন্যই আমাদের সেবা রয়েছে। ২৫টি পর্যন্ত গরুর জন্য আমাদের সেবা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে। ২৫টির বেশি গরু রয়েছে এমন খামারিদের জন্য গরুর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি নেওয়া হয়।
উকিল ডট কম : বাংলাদেশের প্রথম লিগ্যাল টেক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ‘উকিল ডট কম’। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে ঘরে বসেই মামলার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কার্যক্রম সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছে উদ্যোক্তারা। এতে আইনজীবী খোঁজা, আইনি পরামর্শ নেওয়া, মামলার বিভিন্ন ধাপ ও অগ্রগতি জানা এবং প্রতিটি ধাপে খরচের হিসাব দেখার সুবিধা রয়েছে।
প্ল্যাটফর্মটির ‘ফাইন্ড এক্সপার্ট’ অপশনে বিভিন্ন বিষয়ের আইনজীবীদের তালিকা পাওয়া যাবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইনজীবী নির্বাচন করে মামলার বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া যাবে। এরপর মামলা পরিচালনার বিভিন্ন ধাপ, যেমন নথি প্রস্তুত, মামলা দায়ের, প্রথম ও দ্বিতীয় শুনানি এবং রায় পর্যন্ত অগ্রগতি অনলাইনে দেখা যাবে। প্রতিটি ধাপে কত টাকা খরচ হচ্ছে, সেটিও জানার সুযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে মামলার খরচে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ করার লক্ষ্য রয়েছে উদ্যোক্তাদের।
উদ্যোক্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে ইতিমধ্যে ১২০টি মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু মামলা চলমান, কিছু নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার এবং যুক্ত আইনজীবীর সংখ্যা ৪০-এর বেশি। এটি অ্যাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম।
এআই প্রযুক্তিতে বর্জ্য আলাদা করবে স্মার্ট ডাস্টবিন : প্রচলিত ডাস্টবিনে সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে ফেলার কারণে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্যও অনেক সময় কাজে লাগানো যায় না। এ সমস্যার সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্মার্ট ডাস্টবিন তৈরি করছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দল ‘গ্রিন সিংক’। ডাস্টবিনে থাকা এআই মডেল বর্জ্যরে ধরন শনাক্ত করে তা পচনশীল ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য এ দুই ভাগে আলাদা করবে। ব্যবহারকারীরা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে কিউআর কোড বা এনএফসি ট্যাগ স্ক্যানের মাধ্যমে বর্জ্য ফেললে প্রতিবার একটি করে ইকো পয়েন্ট পাবেন। এসব পয়েন্ট ব্যবহার করে সহযোগী ব্র্যান্ডের ছাড়ের কুপন ও কার্ড নেওয়া যাবে।
উদ্যোক্তাদের একজন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ওবায়েদ রেজা হৃদয় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাম্পাসে ডাস্টবিন থাকার পরও যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা দেখে তৃতীয় সেমিস্টারে এ উদ্যোগের চিন্তা আসে। স্মার্ট ডাস্টবিন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় কী পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং কোথায় ডাস্টবিন উপচে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা শনাক্ত করা যাবে। এসব তথ্য স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হবে, যাতে বর্জ্য সংগ্রহের পথ ও সময়সূচি পরিকল্পনা করা যায়।
এ সামিট উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ‘এআই বিজনেস এক্সপো’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে এআইভিত্তিক দেড় শতাধিক স্টলে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা নিজেদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করেন, সেই সঙ্গে দেশের ২০টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্ভাবিত পণ্যের প্রদর্শন করেন।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ওবায়দুল্লাহ নাভিদ এসেছেন অনলাইনে নিবন্ধন করে। প্রদর্শনী ঘুরে দেখে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেলায় বিভিন্ন এআই প্রযুক্তি ঘুরে দেখেছি। দেশীয় এআই উদ্ভাবনগুলো ভালো লেগেছে। বাংলাদেশের এআই প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার চেষ্টা করছে। দেশে তৈরি হওয়ায় এসব এআই মডেলের খরচও বিদেশি মডেলের তুলনায় কম। মেলায় কয়েকটি এআই মডেল তার পছন্দ হয়েছে। সেগুলো বাসায় গিয়ে ব্যবহারের চেষ্টা করবেন বলেও জানান তিনি।
এআই সামিটে মায়ের সঙ্গে এসেছে শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আনাস রুবায়েত। মায়ের মোবাইলে আসা মেসেজের মাধ্যমে সে এ আয়োজনের বিষয়ে জানতে পারে। আনাস রুবায়েত দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘সকালে মেলায় এসেছি। প্রথমে ঢুকতে দেয়নি। ইচ্ছা ছিল রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার। পরে দুপুরের দিকে আমরা ঢুকতে পেরেছি। এখানে এসে অনেক কিছু দেখেছি, ভালো লেগেছে।’