জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাড়লেন প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম সদস্য সামান্তা শারমিন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত জাতীয় এনসিপির মুখপাত্র হয়েছিলেন তিনি। এরপর গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপির আত্মপ্রকাশের সময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ডিসেম্বরে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকে দলীয় কার্যক্রমে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন সামান্তা শারমিন। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সামান্তা শারমিন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে ‘পদাবনতি’র দুই সপ্তাহ পর দলটি ছাড়লেন তিনি। তবে দল ছাড়ার কারণ হিসেবে চারুকলার শিক্ষার্থী সামান্তা বলেছেন, নিজস্ব রাজনৈতিক ‘লাইন’ স্পষ্ট না থাকায় এনসিপিকে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হারিয়ে যেতে হচ্ছে।
গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের এ দলটিকে এখন জামায়াতের জন্য নানা ইস্যুতে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে। তা ছাড়া এনসিপির ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা দলটির নিজস্ব নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে বলেও মনে করছেন সামান্তা শারমিন। এ ছাড়া এনসিপির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি। কাউন্সিল এড়িয়ে এনসিপির কমিটি পুনর্গঠন নিয়েও নিজের অসন্তোষের কথা উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন।
ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন বলেছেন, ‘এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানোর পরও এনসিপি তার গতিপথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয়নি। সে জন্য তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন।’
পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে সামান্তা শারমিন গণমাধ্যমকে জানান, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আমি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে হোয়াটসঅ্যাপে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি। এ ছাড়া দলের গ্রুপেও সবাইকে পদত্যাগের বিষয়টি জানিয়েছি। এনসিপি ছাড়ার পর কী করতে চান, সে বিষয়েও ধারণা দিয়েছেন সামান্তা শারমিন। পদত্যাগ নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, মানুষ তরুণদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা নিয়ে, যারা পুরনো ক্ষমতা কাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবে না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবে। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় আছে।
সামান্তা লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজনই রাজনীতির চালিকাশক্তি হবে না; মতাদর্শের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্যকে তা গ্রাস করবে না; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকবে না। এ লক্ষ্য সামনে রেখে তরুণসমাজ যদি আবার সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়, তবে তা হতে হবে অতীতের কোনো দলের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টা।’
এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাজ করতে যারা অঙ্গীকারবদ্ধ, তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান, সবাইকে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন। তিনি লেখেন, আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই।