দেশব্যাপী হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুর ঘটনায় দায় নির্ধারণে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করেছে সরকার। এ সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কালের দায়-দায়িত্বও নির্ধারণ করবে এই কমিশন। তদন্ত কমিশনকে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ ৪ নভেম্বর থেকে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির পক্ষে গত বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপন গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়।
তিন সদস্যের কমিশনে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি মামনুন রহমানকে সভাপতি করা হয়। কমিশনের দুই সদস্য হলেন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এএনএম মঈনুল ইসলাম। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাদের দায়-দায়িত্ব বা কার্যপরিধি হবে (ক) হামের টিকা ক্রয় ও বিতরণে বিলম্ব, অনিয়ম ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণ ও দায়-দায়িত্ব চিহ্নিতকরণ; (খ) ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে সুপারিশ প্রদান এবং (গ) কমিশনের বিবেচনায় এতদসংশ্লিষ্ট অন্য কোনো সুপারিশ।
কমিশনকে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ হইতে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। কমিশন তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যেকোনো ব্যক্তিকে কমিশনে তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ তদন্ত কমিশনকে সাচিবিক সহায়তাসহ সব ধরনের সহায়তা প্রদান, কমিশনের ব্যয় নির্বাহ এবং কমিশনকে সহায়তার উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বা উহার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদানের নির্দেশ বাস্তবায়ন করবে।
হামে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার কীভাবে সর্বোচ্চ হলো : চলতি বছরের শুরু থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। অভিভাবক ও চিকিৎসকরা হামের লক্ষণ বুঝতে বুঝতেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর ভয়াবহতা বাড়তে শুরু করে। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, সচেতনতা তৈরিতে পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব এবং সর্বোপরি টিকা স্বল্পতা ও বিতরণে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত মার্চের মাঝামাঝি হাম ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২ হাজারে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার রোগীর হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা বেশি। চলতি নভেম্বরেও প্রতিদিন হামে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল তিনজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর হাম ও হাম উপসর্গে ১ হাজার ২৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০৫ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে একজন ও চট্টগ্রাম বিভাগে দুইজন মারা গেছে। একই সময়ে ৬৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ২৪ হাজার ২১৯ জন। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৩২৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৪৭৫ জন।
ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, টিকার সরবরাহ ঘাটতি ও কেন্দ্রীয় গুদামে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় অসংগতির কারণে টিকা নেওয়ার হার কমে গেছে। কভারেজ ইভালুয়েশন সার্ভে অনুযায়ী, হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দ্বিতীয় ডোজের হার ২০১৯ সালের ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ৮০.৭ শতাংশে নেমে আসে। ফলে বাংলাদেশে প্রায় কোটি কোটি শিশু রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বাইরে থেকে যায়। আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি শিশু, যাদের বয়স ৫ বছরের নিচে।
জরুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এপ্রিলের শুরুতে জরুরি টিকা সংগ্রহ ও দেশব্যাপী গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও টিকাদানের ব্যবধান, জনবল ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে চাপ পড়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে বেগ পেতে হয়।
ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে গেলে প্রাণঘাতী এই রোগের প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার একটি সতর্কবার্তা।
এ দায় কার? চব্বিশের পাঁচ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় ড. ইউনূসের দাবি করা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নুরজাহান বেগমকে। তিনি মূলত একজন ক্ষুদ্রঋণ দক্ষ পেশাজীবী। তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কয়েক মাস পর টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দেশের বিভিন্ন স্থানে তার পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ড. ইউনুস তাকে দায়িত্বে বহাল রাখেন। ওই মন্ত্রণালয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক ড. মো. সায়েদুর রহমান। সচিবের দায়িত্বে ছিলেন মো. সাইদুর রহমান।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপি হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় হিমশিম খায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার সময়মতো টিকা সংগ্রহ ও দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোগুলোতে সরবরাহ করলে ওই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো বলে বর্তমান সরকারের নীতি-নির্ধারকরা বিশ্বাস বরেন।