কয়রার চরে বহুতল ভবন

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:১৭ এএম

খুলনার কয়রা উপজেলার চাঁদ আলী সেতুসংলগ্ন কয়রা নদীর প্রায় ৩০০ বিঘা সরকারি চর দখল করে গড়ে উঠেছে নানা স্থাপনা। কোথাও নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন, কোথাও মাছের আড়ত, কোথাও বালুর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক দোকানঘর। চলছে নতুন স্থাপনা নির্মাণও। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

নদীর চর ভরাট করে ব্যবসার জন্য জায়গা তৈরি করা হচ্ছে। শুধু দখলই নয়, সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে কেনাবেচা ও লিজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে একদিকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে নদীর জায়গা। ঝুঁকিতে পড়ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ ও চাঁদ আলী সেতুর নিরাপত্তা।

সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, বাগালী ইউনিয়নের ষোলোহালিয়া মৌজায় চাঁদ আলী সেতুর নিচ থেকে গিলাবাড়ী পর্যন্ত কয়রা নদীর বিস্তীর্ণ চরজুড়ে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। নদীর তীরের জমি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কোথাও পাকা ভবন, কোথাও টিনের চালার স্থাপনা। আবার কোথাও চলছে নির্মাণকাজ। নির্মাণাধীন স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২০ কক্ষবিশিষ্ট একটি মাছের আড়ত। সেখানে ১৫ জন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা গেছে।

নতুন এই মাছের আড়ত থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে আগে থেকেই আরেকটি মাছের আড়ত চালু রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে মাছ কেনাবেচা। পুরনো আড়তের পাশাপাশি নদীর চরে নতুন করে আরও আড়ত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হচ্ছে।

চাঁদ আলী সেতুর কাছেই স্থানীয় ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম নদীর চরে প্রায় ৯ কক্ষবিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করছেন। পাশেই নির্মাণ করা হচ্ছে আরও একটি পাকা ভবন। সিরাজুল ইসলামের দাবি, কিছু জমি তিনি কিনেছেন, কিছু জমি লিজ নিয়েছেন। সাতজন মিলে সেখানে মাছের ব্যবসার জন্য দোকান নির্মাণ করছেন।

জমিটির মালিকানা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু অংশ নদীর চরে, কিছু অংশ কিনেছি এবং কিছু অংশ অন্য একজনের কাছ থেকে লিজ নিয়েছি। সাতজন মিলে এখানে দোকান নির্মাণ করছি।’ জায়গাটি সরকারি কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি সরকারি জমি। সরকার যখন চাইবে, তখন আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। এটি নদীর চর, আমরা এখানে দখল করে আছি। সরকার চাইলে ছেড়ে দিতে বাধ্য।’

নদীর চর ভরাট করে বালুর ব্যবসা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, চরের জায়গাটি বালু দিয়ে ভরাট করতে তার ৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এরপর সেখানে বালুর ব্যবসা শুরু করেছেন। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের ৪ লাখ ঘনফুটের বেশি বালু মজুদ রয়েছে। মনিরুলের দাবি, তিনি একজনের কাছ থেকে জায়গাটি লিজ নিয়ে ব্যবসা করছেন। আশপাশের অনেকেই লাখ লাখ টাকা খরচ করে নদীর চর ভরাট করে দখলে নিয়েছেন। তবে সরকার জায়গা ফেরত চাইলে তারা ছেড়ে দিতে বাধ্য।

২০১০ সাল থেকে মাছের আড়ত : নদীর চরে পুরনো মাছের আড়ত প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আড়তের সভাপতি রোকনুজ্জামান বলেন, ২০১০ সালে কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে জায়গা লিজ নিয়ে সেখানে মাছের আড়ত চালু করেন তারা। তার দাবি, জায়গাটি ব্যক্তিমালিকানাধীন। নতুন করে আরেকটি মাছের আড়ত নির্মাণের বিষয়েও তিনি একই দাবি করেন। রোকনুজ্জামান বলেন, ‘নতুন মাছের আড়ত নির্মাণের জন্য ১৮ জন অংশীদার রয়েছেন। আমরা রেজিস্ট্রি করে, নিয়ম মেনে দলিলের মাধ্যমে জমি নিয়ে এখানে আড়ত তৈরি করছি।’

তবে নদীর চরের জমির ব্যক্তিমালিকানা ও দলিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি নদীর চর ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে এক শ্রেণির মানুষ অন্যদের কাছে জমি বিক্রি ও লিজ দিচ্ছেন। অথচ জমির মালিকানার কাগজপত্র দেখতে চাইলে অনেকেই তা দেখাতে পারেন না। নদীর চর কীভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ৭০ বছরের বেশি বয়সী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ছোটবেলায় এখানে নদীর চর দেখেছি। নদীর পাশে চলাচলের রাস্তা ছিল। এখন সেসব জায়গা দখল হয়ে গেছে। প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে ধীরে ধীরে এখানে দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। একসময় যে জায়গায় নদীর চর ছিল, এখন সেখানে পাকা ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।’

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, চাঁদ আলী সেতু থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরের গিলাবাড়ী বাজার পর্যন্ত নদীর চর ও সরকারি জমির বিভিন্ন অংশ দখল করা হয়েছে। এসব জমিতে সরকারি রাজস্ব ছাড়াই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। তাদের মতে, নিয়ম মেনে এসব জমি ইজারা দেওয়া হলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেত।

বাধা দিয়েও থামাতে পারছেন না ভূমি কর্মকর্তা : উপজেলার বাগালী ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের নায়েব সিরাজুল ইসলাম বলেন, নদীর চরে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে তিনি একাধিকবার ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তার বাধা মানছেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কয়রা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শ্রাবণী বিশ্বাস বলেন, বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের নায়েবকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেখানে কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি আছে কি না, তা-ও যাচাই করা হবে। তার ভাষ্য, নদীর চরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকার কথা নয়।

খুলনা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোছা. রনী খাতুন বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর চর দখল করে এভাবে স্থাপনা নির্মাণের কোনো নিয়ম নেই। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো ) কয়রা উপজেলা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ জানান, পাউবোর বাঁধে দোকানগুলোর তালিকা করা হয়েছিল। বিষয়টি সরেজমিন দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। উপ-সহকারী প্রকৌশলী সোলেমান হোসেন জানান, সব জায়গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নয়। এটি জেলা প্রশাসনের জমি। জেলা প্রশাসক চাইলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

হুমকিতে নদী ও সেতুর নিরাপত্তা : সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীনের আশঙ্কা, নদীর চর দখল ও ভরাট অব্যাহত থাকলে সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদের কয়রা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। নদীর জায়গা সংকুচিত হলে পানিপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙনসহ নানা পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চাঁদ আলী সেতুর আশপাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও নদীর জায়গা দখলের কারণে সেতুটির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

তিনি দাবি করেন, দ্রুত নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে প্রায় ৩০০ বিঘা চর ও সরকারি জমির মালিকানা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ দখল, কেনাবেচা ও লিজের নামে সরকারি জমি হস্তান্তরের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। দখল হওয়া জমি উদ্ধার করে আইন অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হলে সরকার রাজস্বও পেতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত