কথায় আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান।’ অর্থাৎ সময়ের কাজ সময়েই করতে হবে, কোনো কারণে এর ব্যত্যয় ঘটা মানেই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্ম দেওয়া। আমাদের দেশে সরকারিভাবে খাদ্য মজুদে সময়োচিত সঠিক পদক্ষেপের অভাবেই চাল ও গমের মজুদ তলানিতে চলে এসেছে। মূলত সরকারের খাদ্য মজুদের ক্ষেত্রে অদূরদর্শিতার শুরু গত বছর বোরো সংগ্রহ মৌসুম থেকেই। খাদ্য মন্ত্রণালয় গত বছর ২৬ এপ্রিল থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণভাবে ১০ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেও বাড়তি দরের কারণে সংগ্রহ করেছিল ৬ লাখ ৮০ হাজার টন সেদ্ধ চাল এবং দেড় লাখ টন আতপ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কিনতে পেরেছিল ৯৯ হাজার টন। অর্থাৎ বোরো সংগ্রহ মৌসুমে সরকারের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ পুরোপুরি সফল হয়নি। পক্ষান্তরে চাল আমদানির ওপর ৬২.৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ থাকায় বিদেশ থেকে চাল আমদানি হয়েছে মাত্র চার হাজার টন। যদিও সরকার চালের মজুদ বাড়াতে চলতি আমন সংগ্রহ মৌসুমে অভ্যন্তরীণভাবে আট টন সেদ্ধ চাল ও ৫০ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহের ঘোষণা দিলেও ধান-চালের বাড়তি মূল্যের কারণে ১০ শতাংশ চালকল মালিক চুক্তিবদ্ধ হননি। ফলে সরকার কাক্সিক্ষত পরিমাণ চালের মজুদ গড়ে তুলতে পারেনি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গত ৮ মার্চের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চালের মজুদ ৬ লাখ ২৬ হাজার টন এবং গমের মজুদ মাত্র ৯৮ হাজার টন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, যে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তায় সরকারিভাবে কমপক্ষে ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ রাখা প্রয়োজন। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর এক দিনের খাদ্যচাহিদা প্রায় ৪৬ হাজার টন। সে হিসাবে ৬০ দিনের জন্য খাদ্য মজুদ রাখার কথা ২৭ লাখ টন। সেখানে বর্তমানে সরকারের বর্তমান খাদ্য মজুদ প্রায় সাত লাখ টন। স্বভাবতই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ পরিমাণ কাক্সিক্ষত নয়। আবার অনেক সময়ই তথ্য বিভ্রাটের জন্য অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে থাকে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ খাদ্যচাহিদা পূরণের পরও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অতিবৃষ্টি ও পরপর বন্যার কারণে ৩৫টি জেলার আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সারা বছরের উৎপাদন ও চাহিদা বিবেচনা করলে দেশের খাদ্যঘাটতির ‘আপাতত কোনো আশঙ্কা নেই’। কিন্তু ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়নি।
বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে বছরে প্রায় পৌনে চার কোটি টন চাল উৎপাদন হয়ে থাকে। এর মধ্যে সরকার বছরে বোরো ও আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণভাবে ১৪-১৫ লাখ টন চাল সংগ্রহ করে থাকে। যা উৎপাদনের তুলনায় যৎসামান্যই। মূলত বিপুল পরিমাণ এই ধানের মজুদ থাকে চাষিপর্যায়ে। আমরা মনে করি, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত কল্পে শুধু ধান উৎপাদনের হিসাবের ওপর নির্ভর না করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে সঠিক ও সময়োচিত সিদ্ধান্তের অভাবে ভোক্তার কষ্ট বাড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই সে রকমের। এখন স্বল্প আয়ের মানুষদের মোটা চাল ৫০ টাকার ওপরে কিনে খেতে হচ্ছে।
কোনো কারণে সরকারের মজুদ পরিস্থিতি খারাপ হলে এর নেতিবাচক প্রভাবে সাধারণ ভোক্তার কষ্ট বাড়ে। যা লাঘবে সরকার চাল আমদানির ওপর থেকে শুল্কহার দুই ধাপে কমিয়ে ১৫ শতাংশ রেখে বেসরকারিভাবে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন শর্তে কয়েক ধাপে বেসরকারি পর্যায়ে মোট ৩২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়। সর্বশেষ গত ১ মার্চ নতুন করে আরও ৫৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ৮০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়। এ থেকে অনুমেয় সরকার দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণে আন্তরিক হয়েই কাজ করছে। তবু চালের দর কমার বদলে শুধুই বাড়ছে। কারণ আশানুরূপ চাল আমদানি হচ্ছে না। আর হলেও আমদানিকারক কিংবা ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকটের জন্য কারসাজি থাকতেও পারে। মূলত সরকারের খাদ্য মজুদ কমে এলে এবং খাদ্যশস্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের ভার কোনো কারণে ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেলে ভোক্তার গলা কাটা যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। যে কারণে পুরোপুরি শুল্কমুক্ত সুবিধায় চাল আমদানির উদ্যোগ আগেই নেওয়া উচিত ছিল। যদিও সরকার গত ১০ মার্চ জরুরি ভিত্তিতে জিটুজি পদ্ধতিতে ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন সেদ্ধ ও আতপ চাল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তবে সরকার এখন যেভাবে চাল আমদানিতে জোর দিয়েছে, তাতে আমরা আশাবাদী, শেষ পর্যন্ত খাদ্য সংকট হবে না। তবে হয়তো বাড়তি দামেই ভোক্তাদের চাল কিনে খেতে হবে।
ইতিমধ্যেই জিটুজি পদ্ধতিতে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের সিভিল সাপ্লাইস করপোরেশন লিমিটেড (পিইউএনএসইউপি) থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন নন-বাসমতী সেদ্ধ চাল সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সাকননাখোন ন্যাশনাল ফার্মস কাউন্সিল থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার নন-বাসমতী সেদ্ধ চাল ও ভিয়েতনামের সাউদার্ন ফুড করপোরেশন থেকে ৫০ হাজার টন আতপ চাল সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আমদানি করা হবে।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, আফ্রিকার দেশগুলোতে চালের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে চালের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার সুযোগে চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে চালের বাজার অস্থির হচ্ছে। যে কারণে চাল আমদানিতে সরকার যে তোড়জোড় শুরু করেছে, সেটা তিন-চার মাস আগে জিটুজি পদ্ধতিতে শুরু করলে এত দিনে আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে উঠত। আর করোনার শুরু থেকেই বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলে আসছে, পুরো দুনিয়ায় খাদ্যশস্যের চাহিদা এবং মূল্য দুটোই বাড়বে।
স্মরণে থাকতে পারে ২০০৭-০৮ সালের কথা। তখন সেনাসমর্থিত মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার ক্ষমতায়। বলতে গেলে বাংলাদেশসহ পুরো দুনিয়ায় তখন খাদ্যশস্যের কহর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুরো দুনিয়ায় ধরনা দিয়েও কোনো চাল আমদানি করতে পারেনি। সে সময় মোটা চাল ভোক্তাদের ৪০ টাকা কেজিতে কিনে খেতে হয়েছিল। তখন ভারত পাঁচ লাখ টন চাল দিতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত এক টন চালও দেয়নি। দেশের মানুষের চালের চাহিদা পূরণে একমাত্র ভরসা ছিল সারা দেশের ছোট-বড় হাসকিং চালকলগুলো। যারা বড় ধরনের লোকসান দিয়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের আওতায় চাল গুদামে জমা দিয়েছে।
এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দাম বেশি হলেও টাকা দিয়ে চাল পাওয়া যাচ্ছে। আমরা আশাবাদী, এ বছর কৃষক ধানের দাম বেশি পাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি পরিমাণ জমিতে বোরোর চারা রোপণ করেছে। আবাদের অবস্থা খুবই ভালো। বড় কোনো দুর্যোগ না হলে সামনেই নতুন ধান বাজারে চলে আসবে, তখন আর অস্বাভাবিক এই পরিস্থিতি থাকবে না।
বিশেষ করে, সামনের দিনগুলোতে সরকারকে আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে হবে। যে পরিমাণ সংরক্ষণ করার উপযোগী খাদ্যগুদাম আছে, সে পরিমাণ চাল খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই মজুদ করা প্রয়োজন। সে কারণে আগামী বোরো সংগ্রহ মৌসুমে অভ্যন্তরীণভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান, চাল সংগ্রহ করা উচিত। এজন্য দেশের সব চালকল মালিককে চুক্তির আওতায় এনে সংগ্রহ উপযোগী যৌক্তিক দর নির্ধারণ করে চাল সংগ্রহকে জোরদার করতে হবে। তাহলে যেমন কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, তেমনি সরকারের আপৎকালীন খাদ্য মজুদও গড়ে উঠবে।
লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক