ভারতের বীরকন্যারা

আপডেট : ১১ জুন ২০২৩, ১০:৪২ পিএম

শোনা কথা, পৃথিবীর সব চিত্রপরিচালকের কাছেই বড় চ্যালেঞ্জ, চিত্রনাট্য অনুযায়ী ঠিক ঠিক অভিনেতা খুঁজে বের করা। আমার খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে আগামী দিনে যারা কেরালা স্টোরি বা কাশ্মীর ফাইলস কিংবা ১৯৪৬-এর ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নিয়ে দুর্দান্ত সব গোয়েবলসীয় দর্শনকে পর্দায় নিয়ে আসছেন সরকারের অনুগ্রহ লাভের আশায় বা ধরেই নিলাম শিল্পীর দায়বদ্ধতা থেকে, তারা যদি ভেবে থাকেন ভারতীয় জনতা পার্টির বাহুবলী সাংসদ ব্রিজভুষণ শরণ সিংহের ক্যারিশমায় মোহিত হয়ে এক বায়োপিক বানাবেন, তাহলে সেই চরিত্রে অভিনেতা হিসেবে কাকে বাছবেন!!

ব্রিজভূষণ বাবুর অতি বড় বন্ধুও বলবেন না যে তাকে নায়কের শিরোপা দেওয়া হোক। সম্ভবত ব্রিজভূষণ নিজেও তা বলবেন না। তার যা ঝকঝকে জীবনপঞ্জি তাতে খলনায়ক ছাড়া অন্য কোনো কিছু ভাবাই যায় না। দলের মহাসম্পদ, কুস্তি ফেডারেশনের এই প্রাক্তন সর্বভারতীয় কর্তাটি ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে, নির্বাচন কমিশনের কাছে যে হলফনামা পেশ করেছিলেন তাতে এটা পরিষ্কার, সে সময়ে তিনি মোটে চার-চারটি ক্রিমিনাল কেসের আসামি। কয়েক বছর আগে এই কেস ছিল তিরিশটি। তারমধ্যে টাডার মতো শক্তিশালী ধারাও ছিল। কিন্তু বলাই বাহুল্য, আইনকানুন এসব তো গরিবদের জন্য। তিনি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা, তার বিরুদ্ধে আবার কেসটেস কী! ফলে তিরিশ কেস চলে গেছে কোথায় কোন রসাতলে কেউই জানে না।

ব্রিজভূষণের গুণের ঘাট নেই। তিনি নিজেই এক চ্যানেলে দম্ভভরে স্বীকার করেছেন যে, বেশি নয় মাত্র একটি খুন তিনি সারা জীবনে নিজে করেছেন। খুবই মামুলি অপরাধ মানতেই হবে। এত বড় দেশে এক আধটা খুন কি কোনো দোষ হতে পারে!! তার ওপর ব্রিজভূষণের মতো রাম ভক্তের! রামভক্ত তো বটেই। কারণ বাবরি মসজিদ ভেঙে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার অন্যতম কুশীলব তো তিনিই। মহামান্য শ্রীযুক্ত শ্রীল ব্রিজভূষণ শরণ সিং।

এই লোককে নিয়ে একটা শব্দ লেখাও যেখানে বাতুলতা, সেখানে এত কথা লিখে যাচ্ছি, কারণ এ ধরনের পবিত্র নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের ভক্ত এদেশে কিন্তু কম নেই। এ লেখা পড়তে পড়তেও সেসব সিংহপুরুষরা নিশ্চিত আমাকে সমাজ মাধ্যমে ব্যক্তি আক্রমণ করবে বা উপদেশ দেবে সরল সাদাসিধে, গোবেচারা এমনিতেই এখন চাপে আছে। তাকে রেহাই দেওয়া যায় না!!

এই বীরপুঙ্গব ব্রিজভূষণের জন্যই আজ আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ভারতের মুখ পুড়েছে। এই কুস্তি ফেডারেশনের কর্তাটির নামে গুরুতর অভিযোগ এনে তার শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন আমাদের পৃথিবী বিখ্যাত কুস্তিগীররা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সে নানা অসিলায় মেয়ে রেসলারদের শ্লীলতাহানি ও যৌন হয়রানি করেছে। বছরের পর বছর। অভিযোগ করেছেন যারা তারা প্রত্যেকেই হয় কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়াড বা অলিম্পিক পদক পেয়ে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ভোগত, বজরং পুনিয়ারা যখন কোনো না কোনো চ্যাম্পিয়নশিপে মেডেল ঝুলিয়ে ভিক্টরি স্ট্যান্ডে উঠেছেন, জয়ের আনন্দে হাত মুঠো করে আকাশের দিকে তাকিয়েছেন জাতীয় সংগীত, জনগণমন অধিনায়কের সঙ্গে ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়েছে, জাত, ধর্ম নির্বিশেষে ভারতবাসীর চোখে জল এসেছে, আনন্দাশ্রু। কাগজে, চ্যানেলে সম্প্রচারিত হয়েছে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজির বাণীতোমরা, আমাদের সেরা ক্রীড়াবিদরা দেশের নাম উজ্জ্বল করেছ। শুধু প্রধানমন্ত্রী কেন, দেশের কথা ভেবে যাদের রাতে ঘুম হয় না, সেই বর্ণময় ব্যক্তিত্ব, অভিনেতা অনুপম খের থেকে কঙ্গনা রানাওয়াত সবাই ট্যুইট করে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন মেডেলজয়ী ভারত সন্তানদের।

আর আজ যখন এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা নির্দিষ্ট অভিযোগ এনে দিল্লির যন্তরমন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে ধরনায় বসেছেন ব্রিজভূষণের শাস্তির দাবিতে, তখন তাদের মহামান্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনস্ত, বিশ্বস্ত সেবক দিল্লি পুলিশ হিংস্রভাবে এমন ভঙ্গিতে টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তুলছে তা দেখে লজ্জা পাব না ঘৃণায় চমকে উঠব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কয়েকশো ক্যামেরার সৌজন্যে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে মহাভারতের রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের নির্মমতা মনে পড়ে যাচ্ছিল। সেদিন নীরব হয়ে নারীর অবমাননা মেনে নিচ্ছিলেন মহারথী ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, মহাবীর কর্ণ, মহারাজা ধৃতরাষ্ট্র আরও সব মহান কুশীলবেরা। ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর রসিকতা। হিন্দু হৃদয় সম্রাটের কালেই, তথাকথিত সনাতনী ধর্মের স্বঘোষিত রক্ষাকর্তাদের সময়ে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের দৃশ্য পুনর্নির্মিত হলো। অন্য নামে। অন্য পটভূমিতে। কিন্তু নারী সেদিনও ছিল বীরপুঙ্গবদের টার্গেট। আজও, বহু চর্চিত বাগাড়ম্বর বেটি বাঁচাও এর হাস্যকর পরিণতি গোটা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সীমাহীন ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।

অথচ এই সাক্ষী, ফোগত কেউই কিন্তু তথাকথিত টেরোরিস্ট নয়, আরবান নকশাল বা টুকরে টুকরে গ্যাং-এর কেউ বলে এখনো শোনা যায়নি। এখনো শব্দটিতে জোর দিলাম। বলা তো যায় না আগামী দিনে তাদের শরীরেও মহামান্য সরকার বাহাদুর অন্য কোনো ট্যাগ লাগাবেন না। ইতিমধ্যেই দু-একবার মৃদু অভিযোগ এসেছে যে কুস্তিগিরদের ধরনা মঞ্চ থেকে নাকি দেশবিরোধী আওয়াজ উঠেছিল। কে বলতে পারে, আগামী দিনে এই সাক্ষী, ফোগতদের খালিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বলা হবে না!!

একটা ভিডিওতে দেখছিলাম সাক্ষী মালিক বলছেন, কীভাবে তাকে হেনস্তা করা হয়েছে, চোট লেগেছে কোথায় কোথায়। তখনো সাক্ষী বলছেন, আমরা কিন্তু শান্তিপূর্ণ ছিলাম। থাকতে চেয়েও ছিলাম। কিন্তু পুলিশ শুনল না। সেদিন পুলিশের নির্মমতা যারা দেখেছেন, তারা কখনো ভুলতে পারবেন না, আমাদের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদের মুখ কীভাবে পুলিশের বুটে রক্তাক্ত হয়েছে। পুলিশকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। পুলিশের ওপর যা নির্দেশ থাকে তা সে অন্ধভাবে মানতে অভ্যস্ত। উপমহাদেশের এই ট্রাডিশন ব্রিটিশ যুগের। স্বাধীনতার এত বছর বাদেও তা পাল্টায়নি। পাল্টাবে এমন আশাও করি না।

শুধু কখনো কখনো অবাক হয়ে ভাবি ব্রিজভূষণ শরণ সিংদের মতো লোক নাকি গণতন্ত্রের সম্পদ। ফলে তাকে বাঁচাতে এদেশকে যারা আন্তর্জাতিক সম্মান এনে দেয় তাদের ওপর হাত তুলতেও শাসকদের কিচ্ছু এসে যায় না। শুধু ব্রিজভূষণকে শাস্তি দিলে উত্তর প্রদেশে বিজেপির ভোট কমে যেতে পারে এই আশঙ্কায় যাবতীয় নিরাপত্তা বলয়ে থেকে যায় যৌন ব্যভিচারের মতো ভয়ংকর অপরাধের আসামি। দিনের পর দিন শুধু দেখছি দেখব বলে সময় কাটিয়ে দেন আমাদের নীতিবাদী শাসকরা।

আগামী এশিয়ান গেমস বয়কটের হুমকি দিয়ে কুস্তিগীরেরা বলেছেন যে ব্রিজভূষণকে গ্রেপ্তার না করলে তারা একজনও গেমসে যাবেন না। ইতিমধ্যেই দেখছি আমাদের মাননীয় হেভিওয়েট মন্ত্রীরা নানা কৌশলে সাক্ষীদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে কব্জা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যে নাবালক মেয়ের বাবা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে পকসো ধারায় মামলা করেছিলেন, তিনি অজ্ঞাত কারণে সেই মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। হতে পারে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সাক্ষী মালিক বলেছেন যে অসম্ভব মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হচ্ছে। কী ধরনের চাপ তা তিনি ব্যাখ্যা করেননি। করার দরকার নেইও। বোঝাই যায় হেভিওয়েট সাংসদকে বাঁচাতে কী কী চাপ প্রভাবশালী মহল থেকে আসতে পারে।

সাহিত্যিক মতি নন্দীর অসামান্য কোনি উপন্যাসের শেষে সাঁতারে সোনা জেতার পরে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত কোনিকে তার কোচ ক্ষিতিশ সিংহ বলেছিলেন, যে ওই মেডেল ফেডেল কিছু নয়। ওর ভেতরে থাকা কটি বাক্যই আসল। চোয়াল শক্ত করে লড়লে মানুষ পারে, সব পারে। অসম শক্তিধর শাসকদের বিরুদ্ধে লড়তে সাক্ষী মালিক, ফোগতদের কথাগুলো যদি কেউ অনুবাদ করে দিত।

অবশ্য এখনো পর্যন্ত যেটুকু যা বুঝছি, তাতে এটা নিশ্চিত আমাদের বীর কন্যারা সহজে লড়াইয়ের জমি ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। তারা এও জানেন, যে সেলিব্রেটি কঙ্গনা রানাওয়াত বা অন্যান্য অনেকেই পাশে না থাকলেও কপিল দেব, ভারতের ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন সুনীল ছেত্রীর মতো আরও অনেক তারকা তো বটেই, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ দু হাতে তাদের কুর্নিশ করছেন। গণতন্ত্রের খলনায়কের বিরুদ্ধে তাদের এই আপসহীন লড়াইয়ে সেই সাধারণ মানুষ পাশে আছে।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত