ভর্তুকি আর ক্যাপাসিটি চার্জের পাটিগণিত

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ১০:৪৪ পিএম

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। চাল, আটা, ডাল, তেল, চিনি তো বটেইএসব দ্বারা তৈরি বিস্কুট, চানাচুর, মিষ্টি, কেক সবকিছুর দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে পাশের দেশসমূহের তুলনায় বাংলাদেশ যে সবচেয়ে এগিয়ে নানা জরিপে তা বলা হচ্ছে। যাদের এসব দেখার কথা, তারা কখনো করোনা, কখনো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আর সর্বশেষ বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। ফলে দাম বাড়ছে এবং মানুষ অসহায়ের মতো তা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আয় বাড়ানোর পথ বেশির ভাগ মানুষের জন্য খোলা নেই। তাই তারা খরচ কমানোর পথ খুঁজছেন প্রতিনিয়ত।

এই পরিস্থিতিতে আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জনগণকে বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে সরকার লোকসান করছে। লোকসানের কারণে বিদ্যুতের জন্য সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। কত দিন আর ভর্তুকি দেবে সরকার? তাই ভর্তুকির ভার কমাতে পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মাধ্যমে সরকার। মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে বিক্রি করবে ৬ টাকা ২০ পয়সা, যা আগে ৫ টাকা ১৭ পয়সা ছিল। বলা হয়েছিল খুচরা গ্রাহকপর্যায়ে আপাতত দাম বাড়ানো হবে না এবং গ্রাহকদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু এরই মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে গ্রাহকপর্যায়ে ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির।

বিইআরসি চেয়ারম্যান ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির কথা’ বিবেচনা করে বিদ্যুতের বাল্ক মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের এই সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন। ডিসেম্বর মাসের বিল থেকে এই নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে। বিদ্যুতের মূল্য প্রতি ইউনিট ১ টাকা ৩ পয়সা বৃদ্ধির ফলে কত আয় বাড়বে বা কতখানি ভর্তুকি কমবে সে হিসাবও তারা দিয়েছেন।

কমিশন হিসাব করে দেখেছে, নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার ফলে পিডিবির আয় বছরে আট হাজার কোটি টাকা বাড়বে। কিন্তু তার পরও ভর্তুকি দিতে হবে। এবং তাদের হিসাব অনুযায়ী ইউনিট প্রতি দাম বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৮ পয়সা করলে পিডিবি পুরো ১৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি থেকে হয়তো মুক্ত হতে পারত। প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কী হতো? গত এক যুগ তো বটেই তারও আগে থেকে মানুষ শুনে আসছেন ভর্তুকির ভার আর সহ্য করা যাচ্ছে না। দাম বাড়াও ভর্তুকি থেকে বিদ্যুৎ খাতকে রেহাই দাও। কিন্তু ইতিহাস বলে দাম বাড়ানো হলো বারবার অথচ লোকসানের কবল থেকে বাঁচল না বিদ্যুৎ খাত। তাহলে খুঁজে দেখা দরকার সমস্যাটা কোথায়? আর দাম বাড়ানো সহজ সমাধান হলেও কার্যকর সমাধান কী?

এবারের দাম বাড়ানোর পর বিবেচনা করে দেখা যাক, দাম বাড়বে কীভাবে, কোথায় এবং কতটুকু। নতুন পাইকারি মূল্যহার অনুযায়ী শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত ডেসকোর ৩৩ কেভি লাইনে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ ৭ টাকা ৭৪ পয়সা। আর ডিপিডিসির ৩৩ কেভি লাইনের বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ৭ টাকা ৭২ পয়সা। বাংলাদেশ পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ডের সমিতিগুলোর ৩৩ কেভি লাইনের জন্য প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে ৫ টাকা ৩৯ পয়সা যা, পাইকারি বিদ্যুতের সর্বনিম্ন দর।

দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি নিয়ে যারা সরকারের ভূমিকা বিশ্লেষণ করেন তেমন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় সরকার মুনাফা যৌক্তিক করেনি বরং অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয় ও মুনাফা যদি যৌক্তিক করা হতো তাহলে তেল, বিদ্যুৎ, গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় কমত এবং সরকারের ভর্তুকি কমত। সরকার বলছে, তারা ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা করছে কিন্তু সেটা আর করতে হতো না, দুর্নীতি কমালে এমনিতেই লোকসান কমে যেত তাহলে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনটাও কমে যেত আর মানুষ সহনীয় দামে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ কিনতে পারত।

দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। তবে ব্যবহার হয় মাত্র সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। ফলে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন না করে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রাখা হলেও এর বিপরীতে ক্যাপাসিটি চার্জ বা সক্ষমতার ব্যয় হিসেবে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হচ্ছে সরকারকে প্রতি বছর। গত অর্থবছরের (২০২১-২২) প্রথম ৯ মাসেই (জুলাই-মার্চ) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য সক্ষমতা ব্যয় বাবদ সরকারকে গুনতে হয়েছে ১৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৯০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৬৮৫ কেটি টাকা। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৮ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে দেওয়া হয়েছে ১৮ হাজার ১২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় তিন বছরে ভাড়া দেওয়া হয়েছে ৫৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা।

একটু তুলনা করে দেখা যাক, পদ্মা সেতু তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর এই ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয় ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্ররেন্টাল ও কুইক রেন্টাল, ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ এবং ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারদের (আইপিপি) কাছে। ভারতের আদানি গ্রুপ এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদনে যায়নি। কিন্তু ২০১৭ সালে পিডিবি তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করে। ওই চুক্তির কারণে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের কাছে তাদের পাওনা হয়েছে ১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। আরও কয়েকটা উদাহরণ দেখা যেতে পারে। যেমনকেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ের এপিআর এনার্জি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াট। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কেন্দ্রটি থেকে মাত্র ৩৪ লাখ ৪৮ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, যা সক্ষমতার ১ শতাংশেরও কম। কিন্তু কেন্দ্রটিকে ৫৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়। ফলে আইপিপি কেন্দ্রটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে ১ হাজার ৫৭৯ টাকা ৫৭ পয়সা, যা দেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ কেনার সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে। ২০২০-২১ অর্থবছরে একই বিদ্যুৎকেন্দ্র ৭ কোটি ৭২ লাখ ইউনিট উৎপাদন করায় প্রতি ইউনিটের খরচ পড়েছে ৮৯ টাকা। এই অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি দাম পড়েছে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সিরাজগঞ্জের প্যারামাউন্ট বিট্যাক এনার্জি লিমিটেডের উৎপাদিত বিদ্যুতের। প্রতি ইউনিটের দাম পড়েছে ১৮০ টাকা। ১৫২ টাকার বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, অথচ বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ থেকে ৪৮ ভাগ গড়ে অব্যবহৃত থাকে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ না কিনলেও ভাড়া দিতে হয়। ফলে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের অনেক দাম বেড়ে যায়। এখন আরও নতুন কটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়েছে চলছে। ফলে বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া কমবে না।

সরকার বিদ্যুৎকে সেবা খাত নয় বাণিজ্যিক খাত হিসেবে বিবেচনা করে রাজস্ব আহরণের খাত বানিয়ে ফেলেছে। এবং এই খাত থেকে সরকার ১৮ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করছে। এর জন্য যে প্রক্রিয়া চালু করেছে তাতে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠনের একটি পদ্ধতি তৈরি হয়ে গেছে। দেশের উন্নয়ন আর উৎপাদনের স্বার্থে এই খাতকে বাণিজ্যিক নয়, জনমুখী করা দরকার ছিল। আর সেটা করতে চাইলে এই খাত এবং বোর্ড থেকে বা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে আমলাদের সরাতে হবে। এমন আরও অনেক সংস্কার প্রস্তাব সরকারকে বারবার দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন সেসব শোনা হচ্ছে না, তাদের প্রস্তাবের কোনো দুর্বলতা আছে কি, তা জানা নেই কারও। তবে এটা পরিষ্কার যে, এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে এত বিতর্ক বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হতো না।

বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়ানো হয়েছেএমন খবরে বিতরণ কোম্পানিগুলোও নড়েচড়ে উঠেছে। তারাও গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন তৈরি করছে। পাইকারি বিদ্যুতের দরবৃদ্ধি বিবেচনা করে গ্রাহকপর্যায়ে মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেবে ছয় বিতরণ কোম্পানি। তাদের দেওয়া প্রস্তাবের ওপর শুনানি করে নতুন মূল্য ঘোষণা করবে বিইআরসি। এরই মধ্যে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, পাইকারি মূল্য যে হারে বাড়বে, সে অনুসারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হবে। এ বিষয়ে কাজ চলছে। ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) জানিয়েছে, তারাও প্রস্তাব তৈরি করছে। অর্থাৎ গ্রাহকপর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়বে অচিরেই।

উন্নয়ন আর উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিদ্যুৎ জড়িয়ে থাকে জীবনের সব প্রয়োজনের সঙ্গে। বিদ্যুতের দাম তাই ভাবিয়ে তোলে সব মহলকে। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ, সরকারের ভুলনীতি, নানা ধরনের অপচয়, অপব্যয়, দুর্নীতিসবকিছুরই প্রভাব পড়ে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে। দাম বাড়ানোর ফলে কৃষি, শিল্প, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, বিনোদনের সব শাখায় ব্যয় বৃদ্ধির আঘাতে জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নয় বিদ্যুতের জন্য রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুর্নীতি কমানোটাই এখন জরুরি।লেখক 

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত