নির্মমতার শিকার গৃহপরিচারিকা এবং কঠোর বাস্তবতা

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:০৪ পিএম

গত কবছর ধরে করোনার ভয়াল থাবায় গোটা বিশ্ব তছনছ হয়েছে। যার কবল থেকে আমরাও মুক্তি পাইনি। তবে করোনা প্রতিরোধে সরকারের ভ্যাকসিন কর্মযজ্ঞ সেই ভয়াবহতাকে অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এখনো বাংলাদেশ পুরোপুরিভাবে করোনা মুক্ত হতে পারেনি। যদিও আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার খুব কম। আবার ডেঙ্গুর কবলে বাংলাদেশ অনেকটাই যেন অসহায় হয়ে পড়েছে! প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি মৃত্যুর সংখ্যাও কমছে না; বরং প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। আমরা জানি, ডেঙ্গুর বাহক একমাত্র মশার কামড়। তবে সব মশা নয়, এডিস মশা কামড়ালে ডেঙ্গুতে মানুষ আক্রান্ত হয়। অথচ মশা নিধনে সরকারি ব্যয় বরাদ্দ বাড়লেও মশা নিধনে সিটি করপোরেশন যে পুরোপুরি ব্যর্থ, যা নির্দ্বিধায় বলা যায়। ফলে জনজীবনে ডেঙ্গু আতংক প্রতিটি মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিনই মৃত্যুবরণ করছে সম্ভাবনাময় কত মানুষ। বিশেষ করে, শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। ইতিমধ্যেই ডেঙ্গুতে মারা গেছে অনেক শিশু। এর শেষ কোথায়, তা কারও জানা নেই।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘আক্রান্ত সুমি দেখল মায়াহীন বাস্তব’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে দেখলাম, ঢাকার কমলাপুর এলাকায় এক দম্পত্তির বাসায় মাসিক এক হাজার টাকায় কাজ করত ১০ বছর বয়সী শিশু সুমি। জ¦রে আক্রান্ত হলে বাসায় কাজের ছেলে আজিজুলকে দিয়ে মুগদা হাসপাতালে ভুয়া অভিভাবক রুহুল আমিন নামে ভর্তি করে রেখে যায়। সুমি হাসপাতালের মেঝেতে দুদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর ওর ভাগ্যে বেডের দেখা মিলে। কিন্তু অভিভাবকহীন একা সুমির দেখভাল করার মতো কেউই ছিল না। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন নার্গিস বেগমের মায়া হয় অসহায় সুমির জন্য। নার্গিস বেগম সুমির জন্য নতুন জামা কাপড় ও খাবার কিনে আনে। অথচ সুমির গৃহকর্তা একজন মানবাধিকার কর্মী হওয়ার পরও নিজে কিংবা তার স্ত্রীও সুমিকে দেখতে একবারের জন্যও হাসপাতালে আসেননি। কী নির্মমতা! মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন গৃহকর্তা নুরউদ্দিন। ওনার কাছ থেকে বাসার কাজের শিশু মেয়ের প্রতি অবহেলা, অবজ্ঞা, দায়িত্বহীনতা কোনোভাবেই আশা করা যায় না। আর গৃহকর্ত্রী আশা যাকে সুমি ‘ম্যাডাম’ বলে ডাকতেন, তারও একবারের জন্য মন গলেনি। অথচ অন্য রোগীর স্বজন নার্গিস বেগমের খারাপ লেগেছে সুমির কষ্ট দেখে। এটাই বাস্তবতা; সবাই যে অমানুষ নয়, নার্গিস বেগমের মতো হৃদয়বান মানুষ তা প্রমাণ করলেন।

সুমির শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। ওকে অক্সিজেন দিতে হতো দিনে কয়েকবার করে। শ্বাস কষ্টও ছিল প্রচুর। ভাগ্যিস মিডিয়ার বদৌলতে সমাজকল্যাণ দপ্তরে আসে সুমির দুরবস্থার বাস্তব চিত্র। এখন সমাজকল্যাণ তহবিল থেকে সুমির চিকিৎসার খরচ বহন করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সুমির ভাগ্যে কী আছে, তা হয়তো কারও জানা নেই। তবে খবরে যতটুকু জেনেছি, ওর শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। আমরাও আশা করি, সুমি সুস্থ হয়ে উঠুক।  মায়ায় ভরা মুখখানা দেখলাম, পত্রিকার পাতায়। সুমির বাবা বিলম্বে হলেও খবর পেয়েছে, তার আদরের সুমি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ওর বাবা হযরত আলী জামালপুর থেকে ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। দরিদ্র বাবা হযরত আলীর কিই বা করার আছে? তিনি নিজেও অসুস্থ। বড় মেয়ের বিয়ে হলেও বাকি পাঁচ ছেলে-মেয়েকে নিয়ে অতি কষ্টের সংসার হযরত আলীর। তা নাহলে আদরের শিশু সুমিকে মাসিক এক হাজার টাকার বিনিময়ে কি ঢাকা শহরে অন্যের বাসায় কাজ করতে দিত? অথচ এই বয়সে সুমির হাতে থাকার কথা ছিল বই আর কলম। দুর্ভাগ্য, বই কলমের বদলে অন্যের বাসায় কাজ করে নিজের পরিবারকে সাহায্য করছে অসহায় সুমি।

বাস্তবতা হলো, এমনি হাজারো সুমি গোটা দেশে সর্বত্র বিরাজমান। যাদের করুণ কাহিনি হয়তো সবার জানার কথাও নয়। তবে প্রতিবেশী অনেকেরই জানা আছে, দরিদ্র এসব পরিবারের নিত্যদিনের করুণ আহাজারি। যারা মফস্বল শহর কিংবা গ্রামে বসবাস করি, আমাদের চোখের সামনে এমনি হাজারো সুমির পরিণতি নিজের চোখে হরহামেশাই দেখছি।

অতিসম্প্রতি চিকিৎসাজনিত কারণে আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম। খুব সকালে দেখলাম ফুটপাতে সারি সারি কত মানুষ শুয়ে আছে।  সিটি করপোরেশন বা সরকারের তরফে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, দিনে কিংবা রাতে ঘুমানোর সময় যেন মশারি ব্যবহার করা হয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার কবল থেকে বাঁচার অবলম্বন মশারি ব্যবহার। অথচ ঢাকা শহরে হাজার হাজার মানুষকে খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে মশারিবিহীন ঘুমাতে হচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ড্রেনের পাশে ওরা নির্বিঘেœ ঘুমাতে চাইলেও দেখলাম হাত দিয়ে মশা তাড়াচ্ছে আর ক্ষুধার্ত ক্লান্ত শরীরে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।  কারও যেন করার কিছুই নেই! এই হলো বাস্তবতা!

অথচ স্বপ্ন ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। শোষণ-বঞ্চনা দূর হবে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু মৌলিক অধিকারগুলোর প্রকৃত বাস্তবায়ন আজও হয়নি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছেই। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানও অনেক বেড়েছে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। দেশের অর্থ বিদেশে দেদার পাচার হচ্ছে। বিনিয়োগ বাড়ছে না। ফলে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। উল্টো বেকারত্ব প্রতিনিয়তই বাড়ছে। মানুষ গ্রাম ছেড়ে নগর, মহানগরে ছুটছে। ফলে মেগাসিটি ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে দুই কোটি হয়েছে। ভাসমান বিপুল এসব মানুষের স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় নগর মহানগরের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যরে কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। পরিণামে মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ছে। নানা রোগজীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডেঙ্গুর মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার দুর্নীতি নামক অভিশাপে জনগণের অর্থের অপচয়ও রোধ হচ্ছে না। ফলে ওষুধ ছিটিয়েও এখন আর মশা মরে না। মশা যেন হয়ে গেছে পরাক্রমশীল শক্তিধর মৃত্যুদানব!

এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দুটোই বেশি। এ অবস্থা যে মহামারীর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে অজুহাতই দেন না কেন, বাস্তবতা হলো মশা নিধন কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে হবে। আর ভালো মানের ওষুধ আমদানি করতে হবে। স্মরণে রাখতে হবে, মশা নিধন করতে না পারলে ডেঙ্গুর অভিশাপ থেকে দেশের মানুষকে বাঁচানো যাবে না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি দেশের মানুষকেও সচেতন হতে হবে।

লেখক : কৃষি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

  [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত