সেনেগালে ভালো স্বামী হওয়ার স্কুল

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৫, ০৬:১৭ পিএম

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালের রাজধানী ডাকারে কোনো এক সন্ধ্যায় স্বামীরা জড়ো হয়ে বসে আছেন। অধীর আগ্রহে তারা একজন ইমামের কথা শুনছেন। ইমাম তাদের বুঝাাচ্ছেন সংসারে নারীদের পাশাপাশি পুরুষের ভূমিকা।

ইমাম ইব্রাহিমা দিয়ান (৫৩) মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উদ্বৃতি দিয়ে বলেন, ‘রাসূল (সা.) নিজেই বলেছেন, যে পুরুষ তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণে সাহায্য করে না, সে ভালো মুসলমান নয়।’

তিনি নিজের সন্তানের গোসল করানো থেকে শুরু করে স্ত্রীকে অন্য কাজে সহায়তার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরছিলেন। তার কথা শুনে ১৪ জনের ওই দলের কেউ কেউ হেসে উড়িয়ে দিলেও কেউ কেউ আবার হাততালিও দিয়েছে।

১৪ জনের দলটি মূলত জাতিসংঘের সমর্থনে পরিচালিদ স্কুল ফর হাজব্যন্ডস বা ‘স্বামীদের স্কুল’-এর একটি অংশ। ব্যতিক্রমী এই স্কুলে সেনেগালের সমাজের পুরুষরা স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিষয়ে ‘ইতিবাচক পুরুষত্ব’ শেখেন এবং তা সম্প্রদায়ে প্রচার করেন।

সেনেগালসহ পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য গ্রামীণ ও রক্ষণশীল সমাজে দেখা যায় পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত পুরুষের কথাই শেষ কথা। নারীরা পরিবার পরিকল্পনা বা প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া, হাসপাতাল প্রসব বা প্রসূতিপূর্ব সেবা পাওয়ার মতো জীবন-পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তের জন্যও স্বামীর অনুমতি চাইতে বাধ্য থাকেন।

এই স্কুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পর দিয়ান শুক্রবার জুমার খুতবায় নিয়মিত লিঙ্গ ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা করেন। তার আলোচনায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা থেকে শুরু করে এইচআইভি নিয়ে কুসংস্কার দূরীকরণ পর্যন্ত বিষয়গুলো স্থান পায়।

তিনি বলেন, ‘অনেক নারী আমার খুতবা পছন্দ করেন। তারা বলেন, আমার আলোচনা শোনার পর তাদের স্বামীদের আচরণ অনেক বদলে গেছে। পাশাপাশি অনেক পুরুষ জানিয়েছে, এসব অলোচনা শোনার পর তারাও আরও যত্নশীল স্বামী ও পিতা হতে উৎসাহ পেয়েছে।’

৬০ বছর বয়সী সাবেক সেনা কমান্ডো হাবিব দিয়ালো বলেন, খুতবা ও ইমামের আলোচনায় অংশ নেওয়ার পর তিনি ঘরে প্রসবের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের গর্ভবতী স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। শুরুতে ছেলে খরচের ভয়ে ও হাসপাতালের ওপর আস্থা না থাকায় রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু আমি যখন বুঝালাম, হাসপাতালে প্রসব করানো মা ও শিশুর জন্য কতটা নিরাপদ, তখন সে সম্মত হলো।’

২০১১ সাল থেকে স্বামীদের জন্য স্কুলের কার্যক্রম চলে আসছে সেনেগালে। এই উদ্যোগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের নারী, পরিবার, লিঙ্গ ও শিশুসুরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। তারা মনে করে, মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যুহার কমাতে এটি কার্যকর কৌশল।

এই উদ্যোগটি আফ্রিকার আরও কিছু দেশে যেমন নাইজার, টোগো ও বুর্কিনা ফাসোতেও চালু আছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের মতে, এসব দেশে পুরুষদের সম্পৃক্ততার ফলে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য সেবায় প্রবেশাধিকার বেড়েছে, পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রসূতিপূর্ব সেবা ও দক্ষ ধাত্রীদের সহায়তা গ্রহণের সুযোগও বেড়েছে।

পুরুষদের আলোচনায় মেয়েদের অধিকার, সমতা এবং নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতির ক্ষতিকর প্রভাবও গুরুত্ব পায়।

বর্তমানে সেনেগালে এরকম ২০টির বেশি স্কুল চালু আছে, আর তিন শতাধিক পুরুষ এতে অংশ নিয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন।

কিছু সম্প্রদায়ে যারা আগে কট্টর পিতৃতান্ত্রিক নিয়ম মানতে বাধ্য করত, তারা এখন সমতার প্রচার করছে—যার ফলে বাল্যবিবাহ কমেছে এবং পরিবার পরিকল্পনার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, জানাচ্ছে দেশটির জেন্ডার মিনিস্ট্রি।

পুরুষদের এসব গ্রুপে নেওয়া হয় বিশ্বাসযোগ্যতা, নেতৃত্ব ও প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। প্রার্থীদের অবশ্যই বিবাহিত, স্থানীয়ভাবে সম্মানিত এবং নারীর স্বাস্থ্য ও অধিকারের সমর্থক হতে হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে তারা সহপাঠ শিক্ষকের মতো কাজ করেন, বাড়ি বাড়ি যান এবং অনানুষ্ঠানিক আলোচনার আয়োজন করেন।

গত এক দশকে সেনেগালে মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যুহার কিছুটা কমেছে, তবে এখনও অনেক পথ বাকি। ২০২৩ সালে দেশটিতে প্রতি এক লাখ প্রসবের মধ্যে ২৩৭টি মাতৃমৃত্যু হয়েছে, আর প্রতি ১০০০ নবজাতকের মধ্যে ২১ জন জন্মের প্রথম মাসেই মারা গেছে। জাতিসংঘের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু কমিয়ে প্রতি ১ লাখে ৭০ এবং নবজাতক মৃত্যু কমিয়ে প্রতি হাজারে ১২ জনের নিচে নামিয়ে আনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত