আবাসন খাতে আবারও ধাক্কা বাড়তে পারে ফ্ল্যাটের দাম

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৩৩ এএম

নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতেই টালমাটাল অবস্থায় দেশের আবাসন খাত। এর মধ্যে বাজেটে নির্মাণ খাতের অন্যতম উপাদান রডের ওপর কর (ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আবাসন খাতে আবারও বড় ধাক্কার শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ফ্ল্যাটের দামের ওপর পড়তে পারে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিভিন্ন ধরনের এম.এস (মাইল্ড স্টিল) প্রোডাক্টের রড উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফেরো-ম্যাঙ্গানিজ ও ফেরো-সিলিকো-ম্যাঙ্গানিজ অ্যালয়ের ওপর কর ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। ফেরো-সিলিকন অ্যালয়ের কর ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। স্ক্র্যাপ/শিপ স্ক্র্যাপের কর ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৫০০ টাকা, রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ থেকে প্রস্তুতকৃত এম.এস পণ্যের কর ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ১০০ টাকা, মেলটেবল স্ক্র্যাপ  থেকে প্রস্তুতকৃত সব ধরনের বিলেট ও ইনগটের কর ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৯০০ টাকা, বিলেট/ইনগট থেকে প্রস্তুতকৃত এম.এস. পণ্যের কর ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২ হাজার টাকা এবং গর্দা/মেলটেবল স্ক্র্যাপ থেকে প্রস্তুতকৃত ইনগট/বিলেট এবং ইনগট/বিলেট থেকে প্রস্তুতকৃত এম.এস. পণ্যের কর ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রডের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট বসানোর ফলে নির্মাণ ব্যয় অনেক বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ফ্ল্যাটের দাম ও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। এমনিতেই যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা অজুহাতে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ছে। এতে চুক্তিমূল্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বাজেট উপস্থাপনের পর আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতের জন্য প্রত্যাশিত কোনো কার্যকর নীতিসহায়তা বা প্রণোদনার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপের ফলে নির্মাণ ব্যয় আরও বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রডের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপ নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ফ্ল্যাটের মূল্য এবং সাধারণ ক্রেতাদের ওপর।’

তিনি বলেন, রিহ্যাব দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি, নিবন্ধন ব্যয় কমানো হলে প্রকৃত লেনদেন বৃদ্ধি পাবে, আবাসন খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। কিন্তু এবারের বাজেটে এ বিষয়ে আমাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

তিনি আরও বলেন, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই খাতের সঙ্গে প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। ফলে আবাসন খাতের গতি কমে গেলে শুধু ডেভেলপার বা ক্রেতারা নয়, রড, সিমেন্ট, সিরামিক, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, আসবাবপত্র, পরিবহনসহ অসংখ্য শিল্প এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার ফলে আবাসন খাত আরও সংকুচিত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও পড়বে।

ড. আলী আফজাল মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে আবাসন খাতকে শক্তিশালী করতে নিবন্ধন ব্যয় কমানো, গৃহায়ণবান্ধব করনীতি প্রণয়ন, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় আবাসন খাতের বিষয়ে রিহ্যাবের উত্থাপিত প্রস্তাব ও দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ আবাসন খাতকে গতিশীল করা মানেই দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত