১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের প্রায় চার মাস পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ায়। আগামীকাল রবিবার দুপুরে বাংলাদেশ বিমানে তিনি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। মালয়েশিয়া থেকে যাবেন চীনে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তার মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার নিয়ে জটিলতার অবসান ঘটাতে চান। আর চীন সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করতে চান। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস (ইবি) আমদানিতে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। দুই দেশে সফরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে যে জটিলতা চলছে তার অবসান ঘটাতে চেষ্টা করব মালয়েশিয়া সফরে। আর রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও দেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে চাই।’
বিশে^র অন্যান্য দেশ থেকে যারা প্রবাসে যান, তারা তিন মাসে খরচের টাকা তুলে নেন। সিন্ডিকেটের কারণে একমাত্র বাংলাদেশ থেকে যারা প্রবাসে যান তারা তিন বছরেও খরচের টাকা তুলতে পারেন না। কেউ কেউ মালয়েশিয়ার জেলে রয়েছেন বিক্রুটিং এজেন্সির অনিয়মের কারণে। এসব সমস্যার সমাধানে আপনি কী উদ্যোগ নেবেন জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশের মাটিতে আইনবহির্ভূত কাজ করে কেউ জেলে গেলে তার বিষয়টি সে দেশের আইনে যা আছে তা হবে। তবে অন্যায়ভাবে কেউ জেলে থাকলে সে বিষয়ে মালয়েশিয়ার সরকারকে অনুরোধ জানাব তাদের ছেড়ে দিতে। খরচের টাকা কীভাবে কমানো যায় সে জন্য আমরা কাজ করছি।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রবাসীকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এমপি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করতে চাই, যাতে মানুষ কম খরচে বিদেশে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।’ একই দাবি জানিয়েছেন মালয়েশিয়া বিএনপির সহসভাপতি, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাহী চেয়ারম্যান মাহবুব আলম শাহ।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নেপালসহ অন্য ১৪টি দেশ যেভাবে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠায়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই নিয়ম করতে হবে। কোন এজেন্সি লোক পাঠাবে তা যেন মালয়েশিয়ার সরকার নির্ধারণ করে না দেয়। সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।’
গত ফেব্রুয়ারি মাসে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ভুটানে হতে পারে বলে গুঞ্জন ছিল। তবে রোজার ঈদের আগে ওমরাহ করতে সপরিবারের সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের কারণে তা বাতিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে মালয়েশিয়াকে বেছে নেয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জোর প্রস্তুতি চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে এখন পর্যন্ত যে পরিকল্পনা রয়েছে, সে অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন। এরপর ২৩ জুন তিনি কুয়ালালামপুর থেকেই বেইজিংয়ে যাবেন এবং ২৬ জুন ঢাকায় ফিরবেন।
সোমবার দিনভর মালয়েশিয়ায় ব্যস্ত সময় পার করে ওই দিনই দেবেন চীনে রওনা। বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এই দুইটি দেশ সফরে স্বাক্ষরিত হতে পারে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)। এর মধ্যে কুয়ালালামপুরে সাংস্কৃতিক ও সন্ত্রাস দমনসংক্রান্ত সহযোগিতা নিশ্চিতে তিনটি এবং বেইজিংয়ে ১০টি এমওইউ স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। বেইজিংয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে অবকাঠামো, জ¦ালানি, শিল্পপার্ক, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও অর্থায়ন। এসবের বাইরেও বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। অবকাঠামো ও শিল্প খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে চীনে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ ছাড়া চীন সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও দেশে চীনে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, আমরা সফল হব। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ও তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর সফল করতে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের দিক থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে শ্রমবাজার বিষয়ে। পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও দেশটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির তালিকায় চতুর্থ দেশ হিসেবে রয়েছে মালয়েশিয়া। তারপরেও দেশটির শ্রমবাজার নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন কারণে এখনো বাংলাদেশের জন্য বন্ধ আছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার খুলতে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তারা গত এপ্রিলে কুয়ালালামপুর সফর করেন। পরে ঢাকায় ফিরে মাহ্দী আমিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জনশক্তি পাঠানোর বিষয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’
এরপর ১৫ জুন ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকের পর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে তারা আশা করছেন।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরে মালয়েশিয়ায় যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকের বৈধ কাগজপত্র নেই, তাদের বৈধতা দেওয়া এবং শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত করে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিতে সব বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর বাইরে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি শিক্ষার্থী যেন দেশটিতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য যেতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ সরকার।
সিন্ডিকেটমুক্ত করার দাবি বায়রার : গত ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এক আবেদন পাঠিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা)। আবেদনে বায়রার ৬৫ জন সদস্য প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন মালয়েশিয়া সফরকে কেন্দ্র করে দেশটির শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত, স্বচ্ছ এবং সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগের ভিত্তিতে উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সহযোগিতা চাইবেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে চীন সরকারের সহযোগিতা চাইবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি দুই দেশ উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) সহযোগিতা আরও জোরদার করবে। এর আওতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানিসম্পদ, স্বাস্থ্য এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে প্রায় ১৫টির মতো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে এসব সমঝোতা স্মারক হবে। তবে এই সফরে যে কয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, যমুনায় আরেকটি সেতু, বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল। সম্প্রতি একনেকে চীনের ঋণে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
২২ জুন বিকেলে মালয়েশিয়া সফর শেষে সরাসরি চীনের একটি উপকূলীয় বন্দর নগরী দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৩ জুন দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। পরে জলবায়ু এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবেন তিনি। ২৪ জুন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিশ্ব অর্থনীতি, বিনিয়োগ প্রবাহ, সবুজ অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু প্রাধান্য পাবে। একই দিনে অবকাঠামো ও শিল্প খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন এবং চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পায়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে।
২৫ জুন বেইজিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ ফোরামে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে প্রায় শতাধিক বিনিয়োগকারী ও শিল্পপতির উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এ সময় চেরি গ্রুপ, হান্ডা গ্রুপ এবং চায়নাটেক্স করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এসব অটোমোবাইল, শিল্প বিনিয়োগ এবং বস্ত্র খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই দিন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগে গত ৬ মে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান চীন সফর করেন। এ সময় বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তারা। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা সহযোগিতা চান। একই সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতেও দুই দেশ সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।