বগুড়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করা দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বিএনপির মিডিয়া সেল থেকেও সামাজিক মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে মৌখিকভাবে নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো লিখিত নির্দেশনা জেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়নি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নামগুলো পরিবর্তনের জন্য আমাকে জানিয়েছেন। তবে নাম পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর থেকে দাপ্তরিক চিঠি আসতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। নির্দেশনা যেহেতু পেয়েছি, আমরা কাজ শুরু করব। বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়, বগুড়ার মোকামতলা উপজেলার নবগঠিত ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান।
গত ১১ জুন বগুড়ার জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কথা জানানো হয়। এতে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়। শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয় ‘মীরবাড়ী’। অন্যদিকে নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় গঠন করা তিনটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয় ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’। চারটি নতুন ইউনিয়নের মধ্যে মীরবাড়ী, সীমান্ত ও দিগন্তএই তিনটির নাম নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নাম ‘মীরবাড়ী’। তার বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সঙ্গে নবগঠিত সীমান্ত ও দিগন্ত ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে নামকরণের প্রক্রিয়া ও গণশুনানি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং এ বিষয়টি জাতীয় সংসদেও তোলা হয়। সংসদে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক যাচাই-বাছাই এবং গণশুনানির মাধ্যমে নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম নির্ধারণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী ইউনিয়নগুলোর নাম পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
নিজ নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণে আপত্তি জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী : প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তার নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্যোগ না নিতে শিক্ষা সচিবের প্রতি নির্দেশনা পাঠিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে গত ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে একটি আধা সরকারি পত্র (ডিও) পাঠিয়েছেন বলে গতকাল প্রতিমন্ত্রীর প্রেস সচিব অধ্যক্ষ আতিকুর রহমান দাবি করেছেন। তিনি জানান, ডিও পত্রে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেছেনদায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের উদ্যোগে ও স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তার নামে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন, যা তার কাছে অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত। তিনি মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পরিচিতি ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণœ রাখাই অধিকতর সমীচীন।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি শিবগঞ্জ-মোকামতলা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের নামকরণ প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের স্বজন ও বংশের নামে করা হয়েছে বলে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় বইছে। এর মধ্যে শিবপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে প্রতিমন্ত্রীর নামে ‘শিবপুর মীর শাহে আলম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামকরণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। এদিকে, গত ১৫ জুন জাতীয় সংসদে জামায়াতের এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ বগুড়ার মোকামতলায় নতুন ইউনিয়নের নাম ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এটা কাকতালীয়।
প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিক জেলে : মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কিছু কনটেন্ট কেন্দ্র করে করা মামলায় দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামকে আদালতের নির্দেশে বগুড়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি ওই মামলার এজাহারভুক্ত ২ নম্বর আসামি। গত বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরের গাছা থানার বোর্ডবাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। গতকাল তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি পোস্টকে মানহানিকর, বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক দাবি করে গত ১৫ জুন আদালতে মামলা করেন বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ এবং দ্য নিউ নেশন পত্রিকার উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি তানভীর আলম রিমন। মামলায় পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বার্তাসম্পাদক, প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বগুড়া সদর থানাকে নির্দেশ দেন। পরে মামলাটি বাংলাদেশ দণ্ডবিধির কয়েকটি ধারা এবং সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় রেকর্ড করা হয়।