জয়েও পা হারানোর ব্যথা

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০২:৫৭ এএম

বিশ্বকাপে বৃহস্পতিবার কাতারের বিপক্ষে ৬-০ গোলের এক ঐতিহাসিক ও চোখধাঁধানো জয় তুলে নিয়েছে স্বাগতিক কানাডা। কনকাকাফ অঞ্চলের কোনো দেশের জন্য বিশ্বকাপে এটিই সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়ের রেকর্ড। তবে এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের আনন্দের মাঝেও কানাডা শিবিরে নেমে এসেছে এক বুকভাঙা বেদনা। দলের প্রাণভোমরা মিডফিল্ডার ইসমায়েল কোনের এক ভয়াবহ ও ক্যারিয়ার-হুমকির ইনজুরি পুরো জয় উদযাপনের রঙকে ফিকে করে দিয়েছে।

ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে তখন ম্যাচজুড়ে লাল জার্সিধারীদের দাপট। প্রথমার্ধেই সাইল লারিনের ১ গোল এবং জোনাথন ডেভিডের জোড়া গোলে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে একক আধিপত্য দেখাচ্ছিলেন স্বাগতিকরা। কিন্তু ম্যাচের ঠিক ৫১তম মিনিটে পুরো স্টেডিয়ামের আবহ এক নিমেষে বদলে যায়। কাতার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় আসিম মাদিবো পেছন থেকে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে ইসমায়েল কোনেকে ট্যাকল করেন। কাতারি ফুটবলারের সেই অবিবেচকের মতো করা ফাউলের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, কানাডার হেড কোচ জেসি মার্শ পরে জানান, তিনি ডাগআউট থেকেই কোনের ‘হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দ’ শুনতে পেয়েছিলেন।

মাঠের লাইভ কমেন্ট্রি ও ডাগআউট থেকে সহকারী কোচেরা চতুর্থ অফিশিয়ালের দিকে চিৎকার করে বলতে থাকেন‘ওর পা তো শরীর থেকে প্রায় ঝুলেই গেছে!’ ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর কোনে মাঠেই লুটিয়ে পড়েন। ইনজুরির ভয়াবহতা ও দৃশ্যটি এতটাই সংবেদনশীল ছিল যে, টিভি চ্যানেলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার কোনো ভিডিও রিপ্লে বা পুনঃপ্রচার দেখানো থেকে বিরত থাকে।

‎ইসমায়েল কোনের ইনজুরির ধরন দেখে মাঠে থাকা দুই দলের খেলোয়াড়রাই চরমভাবে শিউরে ওঠেন। সতীর্থের এ অবস্থা দেখে কানাডার ২০ বছর বয়সী তরুণ ডিফেন্ডার লুক ডি ফুগারোলেস মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কোনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জোনাথন ডেভিড চরম আতঙ্কে মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে যান। ডিফেন্ডার রিচি লারিয়া ক্ষোভে ফেটে পড়ে কাতার খেলোয়াড়দের দিকে তেড়ে যান এবং কানাডার বেঞ্চের খেলোয়াড় ও স্টাফদের সঙ্গে কাতারের ডাগআউটের এক তুমুল বাগ্বিত-া ও হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়।

‎পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেফারি প্রথমে কাতার ডিফেন্ডার মাদিবোকে হলুদ কার্ড দেখালেও, ভিএআর রিভিউয়ের পর তা সরাসরি লাল কার্ডে রূপ নেয়। নিজের করা ফাউলের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে ২৯ বছর বয়সী মাদিবোও কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে মাঠ ছাড়েন।

‎‎মাঠে দ্রুত স্ট্রেচার ও মেডিকেল টিম ছুটে আসে। এ সময় ক্যামেরার চোখ ও বিশ্ববাসীর কাছ থেকে সতীর্থের যন্ত্রণাকাতর মুখের গোপনীয়তা রক্ষা করতে কানাডার খেলোয়াড়রা মাঠের মধ্যে কোনেকে ঘিরে একটি মানবিক বৃত্ত বা আড়াল তৈরি করেন। চিকিৎসকরা কোনের বাম পায়ে এয়ার কাস্ট পরিয়ে এবং মুখে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে যখন তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ব্যথায় নীল হয়ে থাকা কোনে হাত উঁচিয়ে গ্যালারির সমর্থকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। পুরো স্টেডিয়ামের দর্শক তখন দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাদের এই লড়াকু তারকাকে বিদায় জানান।

‎কোনের এ ধাক্কাকে শক্তিতে রূপান্তর করে মাঠে নামে কানাডা। কোনের বদলি হিসেবে মাঠে নামা আন্ডারলেখট মিডফিল্ডার নাথান সালিবা খেলার ৬৪ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে কানাডার চতুর্থ গোলটি করেন। গোল করার পর সালিবা ডাগআউট থেকে কোনের ‘৮ নম্বর’ জার্সিটি এনে গ্যালারির সামনে উঁচিয়ে ধরে এই গোলটি তার ইনজুরিতে পড়া সতীর্থকে উৎসর্গ করেন। পরে জ্যাকব শ্যাফেলবার্গ একটি এবং জোনাথন ডেভিড বিশ্বকাপের আসরে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করলে কানাডা ৬-০ গোলের ঐতিহাসিক জয় পায়।

‎‎ম্যাচশেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই কানাডার কোচ জেসি মার্শ ও কাতারের কোচ হুলেন লোপেতেগির মধ্যে মাঠেই তীব্র বাদানুবাদ ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। কাতার বেঞ্চের এমন অনাকাক্সিক্ষত আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন মার্শ। তবে তিনি নিশ্চিত করেন যে, ম্যাচ শেষে কাতারি খেলোয়াড় মাদিবো কানাডার ড্রেসিংরুমে এসে কোনের কাছে ক্ষমা চেয়ে গেছেন।

‎‎সব বিতর্ক শেষে মাঠের মাঝখানে বৃত্তাকার হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নত করে কোনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে কানাডার পুরো দল। ম্যাচশেষে সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত কোচ জেসি মার্শ বলেন, ‘আজ আমাদের মনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা জানতাম ইসমায়েল চেয়েছিল আমরা যেন কাজটা শেষ করে মাঠ ছাড়ি। আমরা তার জন্য গর্বিত।’

‎‎কোনের ইনজুরির মাত্রা অত্যন্ত গুরুতর। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার বাঁ পায়ের দুটি হাড়ই পুরোপুরি ভেঙে গেছে। হাড়ের স্থানচ্যুতি ঠিক করতে এবং তা পুনরায় জোড়া লাগাতে ভ্যাঙ্কুবারে জরুরি সার্জারি করা হয়েছে। এ ধরনের মারাত্মক ইনজুরি থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে একজন পেশাদার ফুটবলারের সাধারণত ছয় থেকে ১২ মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যায়।

‎‎আইভোরি কোস্ট থেকে ৯ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে কানাডায় চলে আসা ইসমায়েল কোনে ২০২২-এ প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেছিলেন। এবার তার ওপর কানাডি দলটি অনেকাংশ নির্ভরশীল। এমন একজনের ছিটকেপড়া কানাডার জন্য বড় একটি ধাক্কা।‎‎

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এ ধরনের চোটের কয়েকটি ঘটনা আছে

‎ ১৯৮২ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির মিডফিল্ডার এউয়াল্ড লিয়েনের ডান ঊরুর মাংস ছিঁড়ে ১০ ইঞ্চি গভীর ক্ষত তৈরি হয় এবং ভেতরের হাড় উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।

‎ ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ফরাসি ডিফেন্ডার লুইস গ্যারিশোরন পায়ের টিবিয়া ও ফিবুলা হাড় একসঙ্গে ভেঙে টুকরো হয়ে যায়। ফলে তিনি আর আগের ফর্মে ফিরতে পারেননি।

‎ ১৯৮২ বিশ্বকাপে জার্মান গোলরক্ষকের বিপজ্জনক ধাক্কায় ফরাসি ফরোয়ার্ড প্যাটট্রিক বাতিস্তাঁ ‎মাঠেই অচেতন হয়ে কোমায় চলে যান এবং তার ৩টি দাঁত ভেঙে যায়।

‎ ২০২২ বিশ্বকাপে নিজ দলের গোলরক্ষকের হাঁটুর আঘাতে সৌদি আরবের ডিফেন্ডা ইয়াছির আল-শাহরানির চোয়াল ও মুখের হাড় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত