সীমা বাড়ছে ফেনী নদী পর্যন্ত

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০২:৫২ এএম

ফেনী নদীর মোহনা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় আসছে। এর মাধ্যমে আগামীতে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য জেটিও নির্মাণ করা যাবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর নতুন অ্যাংকরেজও পাচ্ছে। অর্থাৎ, সীতাকু- সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলো নিরাপদ আশ্রয়ও পাবে।

নতুন করে সীমা বাড়ানোর কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা আরও ১০ নটিক্যাল মাইল বাড়ানোর জন্য নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এটি অনুমোদন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা উত্তর দিকে বাড়বে। ফলে ফেনী নদীর মোহনা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় চলে আসবে।’ এই সীমা বাড়লে চট্টগ্রাম বন্দর তথা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে কী প্রভাব ফেলবে এই প্রশ্নের উত্তরে কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। ২০৩০ সালে যদি বে টার্মিনাল অপারেশনে আসে, তখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে অবস্থানকালীন মাদারভেসেলগুলোর জায়গার স্বল্পতা হতে পারে। এখন এই সীমা বাড়ানোর মাধ্যমে উত্তর দিকে সীতাকুন্ড পর্যন্ত গভীরতা অনুযায়ী জাহাজ অ্যাংকরেজ করা যাবে। একইসঙ্গে লাইটার জাহাজগুলোও অবস্থান করতে পারবে। আর সন্দ্বীপ চ্যানেল হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে এই জায়গাটি সুরক্ষিত বলে জাহাজগুলোও নিরাপদ থাকবে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে আহমেদ আমিন বলেন, এর মাধ্যমে সীতাকুন্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে আসা জাহাজগুলোও নিরাপদে অবস্থান করতে পারবে। বন্দরের সীমা বাড়লে জাহাজগুলোর নিরাপত্তার জন্য নৌ বাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সহায়তা নেওয়া যাবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের সীমা ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল। পতেঙ্গা লাইট হাউজ থেকে অর্ধবৃত্ত আকারে সাগরের দিকে এই সীমা বিবেচনা করা হতো। ২০০৭ সালে তা ৭ নটিক্যাল মাইলে বর্ধিত করা হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে গিয়ে বন্দরের সীমা বাড়িয়ে ৬২ নটিক্যাল মাইল করা হয়। তখন বন্দরের সীমা উত্তরে ফৌজদারহাট পর্যন্ত এবং দক্ষিণে মহেশখালী পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এখন এই সীমা আরও ১০ নটিক্যাল মাইল উত্তর দিকে বাড়ানোর মাধ্যমে তা মিরসরাই ইকোনমিক জোন হয়ে ফেনী নদীর মোহনা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

পোর্ট সীমা বাড়ালে লাভ কী? : চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, বন্দরের সীমা বাড়ালে এই সীমার মধ্যে অবস্থানকালে জাহাজগুলো নিরাপত্তা ও ড্রেজিং সুবিধা পাবে। আর এর বিনিময়ে বন্দর পোর্ট ডিউস পাবে। এতে বন্দরের রাজস্ব বাড়বে। একইসঙ্গে এসব এলাকায় জেটিও নির্মাণ করতে পারবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জাফর আলমের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের সহ-সভাপতি পারভেজ আহমেদ বলেন, মিরসরাই ইকোনমিক জোন পর্যন্ত বন্দরের সীমা বাড়লে এবং আগামীতে লাইটার জেটি নির্মাণের সুযোগ দিলে পণ্য আনা-নেওয়া সহজ হবে। এতে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানাগুলো সুবিধা পাবে।

জেটি নির্মাণ প্রসঙ্গে কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘জেটি নির্মাণের আগে আইনগতভাবে ওই এলাকাটি বন্দরের সীমায় আনতে হবে। আর এর পরই প্রয়োজনসাপেক্ষে বন্দর কর্তৃপক্ষ জেটি নির্মাণ বা অন্য কোনো কাজে এই এলাকা ব্যবহার করতে পারবে। বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই সীমা বর্ধিত করার প্রস্তাব দিয়েছি।’

আসছে নতুন অ্যাংকরেজ : চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে প্রায় ৪ হাজার জাহাজ চলাচল করে। কনটেইনার ও বাল্ক পণ্যবাহী এসব জাহাজ বন্দরের জেটিতে প্রবেশের আগে বহির্নোঙ্গরের আলফা, বিটা ও চার্লি অ্যাংকরেজ (জাহাজ রাখার স্থান) ও কুতুবদিয়া অ্যাংকরেজে অবস্থান করে। আলফা অ্যাংকরেজ উত্তর দিকে অবস্থিত এবং এখানে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজগুলো অবস্থান করে। অ্যাংকরেজ চার্লি হলো সবচেয়ে দক্ষিণে, এখানে লাইটার জাহাজ ও শিডিউল ছাড়া জাহাজগুলো অবস্থান করে। আলফা ও চার্লির মধ্যখানে হলো বিটা অ্যাংকরেজ। যে জাহাজগুলো বন্দরের জেটিতে ভেড়ার অনুমতি পাবে, সেগুলো এখানে অবস্থান করে। সবচেয়ে বড় মাদারভেসেলগুলো কুতুবদিয়া অ্যাংকরেজে অবস্থান করে।

এ ছাড়া কনটেইনারবাহী জাহাজগুলো বহির্নোঙ্গর থেকে জেটিতে ভিড়লেও বাল্কপণ্যবাহী অনেক মাদারভেসেল (বড় জাহাজ) বহির্নোঙ্গর থেকে লাইটার জাহাজে (ছোট জাহাজ) পণ্য স্থানান্তর করে। লাইটার জাহাজ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব পণ্য পরিবহন করে। এমন লাইটার জাহাজ রয়েছে প্রায় ৪ হাজার। তাহলে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক এখন কি নতুন অ্যাংকরেজ পাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, সীতাকুন্ড এলাকায় আমরা নতুন আরেকটি অ্যাংকরেজ প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে তুলতে পারি। এই জায়গায় পানির গভীরতা বেশি আছে। তাই অনেক মাদার ভেসেল গভীরতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সীতাকুন্ড উপকূলে অ্যাংকরেজ করতে পারবে। আর ওই এলাকাটি সন্দ্বীপ চ্যানেলের কারণে প্রাকৃতিকভাবে নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে।

কথা হয় নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নবী আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বন্দরের সীমা বাড়ালে আমাদের যে ৪ হাজার লাইটার জাহাজ রয়েছে, সেগুলো হয়তো নিরাপদে রাখতে পারব। একইসঙ্গে মিরসরাই ইকোনমিক জোন এলাকায় জেটি নির্মাণ করলে সেসব এলাকায় সহজে পণ্য আনা-নেওয়া করা যাবে।’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯৩ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়। বছরে গড়ে ১৩ কোটি মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি ৩২ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে এই বন্দর দিয়ে। এবছর কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩৫ লাখে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত