ব্রাজিলকে এই ম্যাচে সতর্ক থাকতে হবে

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ০২:২৯ এএম

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দুটি ম্যাচ খেলার পর ব্রাজিল এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আত্মবিশ্বাস ও সতর্কতা, দুটোই সমানভাবে প্রয়োজন। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ড্র এবং দ্বিতীয় ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে জয় সেলেসাওদের নকআউট পর্বের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়; এটি ব্রাজিলের প্রকৃত শক্তি যাচাইয়ের একটি মঞ্চ।

ব্রাজিল যখন বিশ্বকাপে নামে, তখন প্রত্যাশার চাপ অন্য সব দলের চেয়ে বেশি থাকে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাছে শুধু জয় নয়, সুন্দর ফুটবলও দেখতে চায় সমর্থকরা। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে শুধু প্রতিভা দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। প্রয়োজন শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা এবং প্রতিপক্ষকে সম্মান করার মানসিকতা। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে আশার খবর হচ্ছে এই ম্যাচে নামতে পারে সেলেসাওদের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়র। আগের দুই ম্যাচে ইনজুরি তাকে নামতে দেয়নি। শোনা যাচ্ছে, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নেইমার মাঠে থাকবে। আনচেলত্তির এই প্রিয় শিষ্য যদি মাঠে থাকে, তাহলে ব্রাজিল আরও উজ্জীবিত হবে। ভিনিরাও খেলবে দারুণ উদ্যম নিয়ে।

অনেকে হয়তো ভাবছেন, স্কটল্যান্ড ব্রাজিলের তুলনায় দুর্বল দল। কাগজে-কলমে সেটি সত্য হতে পারে। কিন্তু বিশ্বকাপ কখনো কাগজের হিসাব মেনে চলে না। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আমরা অসংখ্য অঘটন দেখেছি। স্কটল্যান্ড ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে তারা সংগঠিত ফুটবল খেলতে পারে। তাদের খেলোয়াড়রা শারীরিকভাবে শক্তিশালী, আক্রমণ-প্রতিরক্ষার রূপান্তর দ্রুত এবং দলগত লড়াইয়ে তারা কখনো হাল ছাড়ে না।

ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ধৈর্য ধরে খেলা। স্কটল্যান্ড সম্ভবত নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজাবে এবং পাল্টা আক্রমণের সুযোগ খুঁজবে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শুরুতেই গোল না এলে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং বলের দখল ধরে রেখে ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করতে হবে।

আমি বিশেষভাবে নজর রাখব ব্রাজিলের মিডফিল্ডের দিকে। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে মাঝমাঠই ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। যদি ব্রাজিলের ক্যাসামিরো, এদেরসন, ফাবিনহো, দানিলোর মতো মিডফিল্ডাররা দ্রুত পাস বিনিময় করতে পারে এবং ভিনি ও মার্তিনেল্লির মতো উইংকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে স্কটিশ রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। কিন্তু যদি মাঝমাঠে অপ্রয়োজনীয় ভুল হয়, তাহলে স্কটল্যান্ডের জন্য ম্যাচে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্ষণভাগ। অনেক সময় ব্রাজিলকে নিয়ে আলোচনা হলে শুধু আক্রমণভাগের কথা বলা হয়। কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে হলে শক্তিশালী রক্ষণ অপরিহার্য। হাইতির বিপক্ষে জয় পাওয়া গেলেও কিছু মুহূর্তে রক্ষণে মনোযোগের ঘাটতি চোখে পড়েছে। স্কটল্যান্ডের মতো দল সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। তাই মার্কিনিওস, ম্যাগলিয়ায়েস, দানিলো, সান্দ্রোর মতো ডিফেন্ডারদের পুরো ম্যাচজুড়ে মনোযোগী থাকতে হবে।

আমি মনে করি, এই ম্যাচটি কোচ আনচেলত্তির জন্যও একটি বড় সুযোগ। নকআউট পর্বের আগে তিনি হয়তো কয়েকজন খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিতে পারেন অথবা বিকল্পদের সুযোগ দিতে পারেন। কিন্তু দলগত ভারসাম্য যেন নষ্ট না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নকআউট পর্বে যাওয়ার আগে একটি ছন্দ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রাজিলের ইতিহাস বলে, তারা যখন আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলেছে, তখন বিশ্বের যেকোনো দলকে হারানোর সামর্থ্য দেখিয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলকে সেই ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হবে। প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

সমর্থকদের জন্যও এই ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ সাধারণত দলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেয়। একটি শক্তিশালী জয় শুধু পয়েন্ট টেবিলে সুবিধা এনে দেয় না, বরং পুরো স্কোয়াডের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, হতাশাজনক পারফরম্যান্স নকআউটের আগে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

আমি আশা করি, ব্রাজিল এই ম্যাচে তাদের ঐতিহ্যবাহী আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলবে। তবে সেই আক্রমণ যেন দায়িত্বশীল হয়। সুন্দর ফুটবল এবং কার্যকর ফুটবলের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই হবে মূল চাবিকাঠি। কারণ বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে ফলাফলই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই শুধু একটি গ্রুপ ম্যাচ নয়। এটি ব্রাজিলের জন্য একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ, তারা কি সত্যিই শিরোপার অন্যতম দাবিদার, নাকি এখনো কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে? উত্তরটা মাঠেই মিলবে।

দুই ম্যাচ শেষে ব্রাজিলকে আমি ইতিবাচক অবস্থানেই দেখছি। গ্রুপ সি-তে মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র এবং হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর চার পয়েন্ট নিয়ে তারা শীর্ষে রয়েছে। কোচ কার্লো আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। পাশাপাশি ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া ও লুকাস পাকেতার মতো তারকারা আক্রমণভাগে প্রতিপক্ষের জন্য সবসময়ই হুমকি। সবচেয়ে বড় সুখবর, ইনজুরি কাটিয়ে নেইমার পূর্ণ অনুশীলনে ফিরেছেন, যা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। তবে এখনই ব্রাজিলকে শিরোপার মুকুট পরিয়ে দেওয়ার সময় আসেনি। মরক্কো ইতিমধ্যে নিজেদের কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রমাণ করেছে, আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচটিও সহজ হবে না। নকআউট পর্বে উঠলে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। আমার মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান ছন্দ ধরে রাখতে পারলে ব্রাজিল অন্তত কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার অন্যতম দাবিদার। আর যদি ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা আরও বাড়াতে পারে, তাহলে সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনালেও তাদের দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

আমার বিশ্বাস, যদি ব্রাজিল নিজেদের সামর্থ্যরে সর্বোচ্চটা দেখাতে পারে, তাহলে তারা জয় নিয়েই মাঠ ছাড়বে। কিন্তু সেই জয় অর্জনের জন্য তাদের পরিশ্রম করতে হবে, শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে হবে এবং প্রতিপক্ষকে যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এর কোনো বিকল্প নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত