সরে দাঁড়ালেন জামায়াতপন্থি ১৮ আইন কর্মকর্তা

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ০২:৩১ এএম

সাতজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) পদত্যাগ করেছেন। তারা সবাই জামায়াতপন্থি। তারা পৃথকভাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর গতকাল মঙ্গলবার পদত্যাগপত্র পাঠান।

পদত্যাগকারী ডিএজিরা হলেন ইউসুফ আলী, শফিকুর রহমান, আবদুল করিম, ফরিদ উদ্দিন খান, গোলাম রহমান ভূঁইয়া, আসাদ উদ্দিন ও তারিকুল ইসলাম। আর এএজিরা হলেন ইমরুল কায়েছ রানা, হুমায়ুন কবির তানিম, আবদুল কাইয়ুম ভূঁইয়া, আবদুল্লাহিল মারফ ফাহিম, জোয়াদুর রহমান, শামসিল আরেফিন, মাহাবুবা আক্তার রলি, নূর নবী উজ্জ্বল, আল রেজা আমির, রেজাউল ইসলাম ও মো. জাকির হোসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা নিয়োগ পেয়েছিলেন।

এদিকে একদিনে সর্বোচ্চ আদালতের ১৮ জন আইন কর্মকর্তার পদত্যাগ নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে আইন ও বিচারাঙ্গনে। কেন তারা পদত্যাগ করেছেন তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। যদিও পদত্যাগকারীরা বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের প্রতিবাদে তারা পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের বিষয়টি সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব অবগত আছেন বলে জানান তারা।

তবে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাদের পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত হুট করে হয়নি। এর পেছনের কারণটি ‘রাজনৈতিক’। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয় ও সরকার গঠনের পর থেকেই অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত বিএনপিপন্থি আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয় জামায়াতপন্থি আইন কর্মকর্তাদের। এ নিয়ে দুই রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি বিরাজ করছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অনুসারী আইন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কাগজপত্রও পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুধাবন করতে পেরেই জামায়াত অনুসারী আইন কর্মকর্তারা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আরও বেশ কয়েকজন জামায়াত ও এনসিপির অনুসারী আইন কর্মকর্তা শিগগির পদত্যাগ করতে পারেন বলে ওই সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত সোমবার পদত্যাগ করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বদিউজ্জামান তপাদার। তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) রাজনীতির করে এবং বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি নামে একটি আইন সংগঠনে সক্রিয় আছেন বলে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে।   

সুপ্রিম কোর্টে বিএনপিপন্থি একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামায়াতপন্থি ডিএজি ও এএজিদের পদত্যাগের জন্য বলা হবে এবং পদত্যাগ না করলে তাদের সরিয়ে দেওয়া হবে, তাদের পরিবর্তে বেশ কয়েকজন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে এমনটা তারা গত কয়েক দিন ধরেই শুনে আসছিলেন।  ডিএজি পদমর্যাদার  আরেক আইন কর্মকর্তা (বিএনপির অনুসারী) বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জামায়াত ও এনসিপিপন্থি আইন কর্মকর্তাদের বরখাস্তের নথিপত্র কয়েক দিন আগে পাঠানো হয়েছে। সেটি বুঝতে পেরেই তারা পদত্যাগ শুরু করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে অর্ধ শতাধিক আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

পদত্যাগকারী ডিএজিরা বলেছেন, উল্লেখিত তিনটি বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের বিরোধিতা তারা ভালোভাবে নেননি। সংসদে যেহেতু জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলের ভূমিকায় আছে, তাই অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে বিএনপিপন্থিদের সঙ্গে তারা থাকতে চান না এবং এ বিষয়টি জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অবহিত করেছেন তারা।

পদত্যাগকারী ডিএজি মো. ইউসুফ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার জুলাই চার্টারের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় আপিল করেছে। একটি সুন্দর সিদ্ধান্ত ছিল সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ। কিন্তু সেটাও ওনারা (সরকার) বাতিল করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক দিন অপেক্ষায় ছিলাম যে সরকার জনগণের পালস বুঝে কি না, কিন্তু দেখছি ওনারা আগের পথেই হাঁটছে। কাজেই আমরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এই দুর্নামটা নিতে চাই না।’ তিনি বলেন, ‘কারও কারও (বিএনপিপন্থি আইন কর্মকর্তা) বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে। আমরা প্রতিবেদনের বিষয়ে জানি। তাই সবকিছুর দায় আমরা নিতে চাচ্ছি না।’  

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে জামায়াতপন্থি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন কি না এমন প্রশ্নে অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি আদালত আলাদা। যিনি বিএনপিপন্থি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তার আদালত আলাদা। কাজেই একজনের আদালতে আরেকজনের হস্তক্ষেপের কিছু নেই বা অসহযোগিতার কিছু নেই।’ দলীয় কোনো নির্দেশনায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু একটা আদর্শ (জামায়াতের রাজনীতি) নিয়ে চলি। বিরোধী দলের পক্ষে আছি, আমাদের দল বিষয়টা জানে।’

রাজনৈতিক বিষয় সামনে এনে পদত্যাগ দুঃখজনক : অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে কারও পদত্যাগ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু তারা (পদত্যাগকারী আইন কর্মকর্তা) তাদের পদত্যাগের কারণ হিসেবে রাজনৈতিকবিষয় নিয়ে এসেছে যা খুবই দুঃখজনক।’ তিনি বলেন, ‘তারা রাষ্ট্রের আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিষয় সামনে আনায় স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারেননি বলেই কি পদত্যাগ করেছেন?’ তাদের সরিয়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না এবং আঁচ করতে পেরেই পদত্যাগ করেছেন কি না, এমন প্রশ্নে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘যদি সেটাই হয়ে থাকে যে, তাদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয় আঁচ করতে পেরেই পদত্যাগ করেছেন তাহলে এটি তাদের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়।’ অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নতুন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনের তাগিদেই আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। যদি প্রয়োজন পড়ে তাহলে সরকার নিশ্চয়ই নিয়োগ দেবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত