রেশ কাটছে না নরসিংদী ভূমিকম্পের। গত ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মারাত্মক কম্পন হয়। সেই কম্পনের পর থেকে এখনো এর আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প হচ্ছে। সর্বশেষ গত সোমবার রাতেও ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয় নরসিংদী ভূমিকম্পের উৎপত্তি কেন্দ্র বরাবর। ২১ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ মাসে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূকম্পন যন্ত্রে ৮টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। একই এলাকায় আরও ভূমিকম্প হতে পারে।
একই এলাকায় বারবার কেন ভূমিকম্প হচ্ছে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর যে পয়েন্টে ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি হয়েছিল, সেই এলাকাটি আমরা সার্ভে করেছি এবং তা নিয়ে গবেষণাও করছি। আমাদের গবেষণায় পাওয়া গেছে, এ ফল্ট লাইনটি প্রায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। আর পুরো এলাকাটি ২০ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে এ ভূমিকম্প জোন। মাটির ১৬ থেকে ২৯ কিলোমিটার গভীরে এ এলাকায় অনেকা ভূমিকম্প হয়েছে এবং সবই প্রথম উৎপত্তি হওয়া ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের আফটার শক।’
গত সোমবার রাতে ৪ রিখটার স্কেলের একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে ঢাকার পাশে রূপগঞ্জ এলাকায়। এ ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিও ঢাকাবাসী খুব বেশি অনুভব করেছে। আর ৪ রিখটার স্কেলের এ ভূমিকম্পনটিও নরসিংদী ভূমিকম্পের আফটার শক হিসেবে গণ্য করছেন জিল্লুর রহমান। শুধু জিল্লুর রহমানই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ঢাউকি ফল্ট নিয়ে পিএইচডি গবেষণারত জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) আখতারুল আহসান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় যত ভূমিকম্প হয়েছে, সবই নরসিংদী ভূমিকম্পের আফটার শক। এমনকি গত ২৭ ফেব্রুয়ারিতে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে ৫ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের যে ভূমিকম্প হয়েছিল, সেটিও ছিল নরসিংদী ভূমিকম্পের আফটার শক।
আরও কি আফটার শক হবে?
যেহেতু ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পর এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়নি, তাই সবই আফটার শক বলে মন্তব্য করেন আখতারুল আহসান। তিনি বলেন, ঢাকা হয়ে নিচের অংশে যতগুলো ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে, সবই নরসিংদী ভূমিকম্পের আফটার শক।
এ এলাকায় কি আর ভূমিকম্প ঘটবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘যেহেতু এখনো এ এলাকায় ভূমিকম্প হচ্ছে, তাই নরসিংদী ফল্ট লাইনটি সক্রিয় ফল্ট লাইন তা নিয়ে আর সন্দেহ নেই।
ভূমিকম্পের মাত্রা কি বড় হবে?
যেহেতু ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নরসিংদী এলাকায় নতুন একটি ফল্ট লাইন পাওয়া গেছে, তাই এখানে ভূমিকম্প হচ্ছে। কিন্তু দেশে মেগাথ্রাস্ট ও ডাউকি ফল্ট এবং মধুপুর ফল্টলাইন (ফাটল রেখা) থাকলেও নরসিংদী ফল্ট লাইনের কথা কেউ জানত না। গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে যখন ঢাকা ও আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে, তখন নতুন এ ফল্ট লাইনের কথা উল্লেখ করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান। তিনি তখনই দেশ রূপান্তরের কাছে বলেছিলেন এটি নতুন কোনো ফল্ট লাইন। আর ওই ফল্ট লাইন কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে অনেক। এতে আমাদের গবেষণার সিদ্ধান্তও প্রমাণিত হচ্ছে।
এ এলাকায় কি আরও মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু সক্রিয় জোন, তাই আরও হতেও পারে। তবে হলেও সেগুলো ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এই যুক্তির সঙ্গে একমত পোষণ করে আখতারুল আহসান বলেন, এর চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ধীরে ধীরে ভূমিকম্প ঘটিয়ে মাটির অভ্যন্তরের শক্তি বের হয়ে আসছে। একই সঙ্গে যে স্থানে ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তি হচ্ছে, সেই এলাকাটি ভারত মহাসাগরীয় প্লেটের প্রান্তীয় অংশ এবং তা বার্মার প্লেটের (মহাদেশীয় প্লেট) নিচের দিকে যাচ্ছে।
কীভাবে বুঝলেন তা বার্মা প্লেটের নিচের দিকে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যেহেতু মাটির কম গভীরতায় এসব ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে, তাই সেগুলোর মাত্রা বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে এ এলাকা ছাড়া দেশের পার্বত্য এলাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী, চাঁদপুর, সিলেট ও উত্তরবঙ্গে এর চেয়ে বড়মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারে।’
অপরদিকে ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে ভবন নির্মাণের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে চলার গুরুত্বারোপ করে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে আর্থকোয়েক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর তা বিবেচনা করেই কিন্তু ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড প্রণয়ন করা হয়েছে। আমরা যদি ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করি, তাহলে ভূমিকম্পে ঝুঁকির মাত্রা কমে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান নগরগুলোর নতুন নতুন ভবন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নমুনা কম। পুরনো ভবনগুলো কিংবা যেসব ভবন প্রকৌশলী ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
উল্লেখ্য, সারাবিশ্বে প্রতি বছর দুই হাজার বার ভূমিকম্প হয়। এদের মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। ছোট-বড় ২৭টি প্লেট নিয়ে গঠিত পৃথিবী প্রতিনিয়ত গতিতে থাকার কারণে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। ইন্ডিয়া ও বার্মা প্লেটের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণেই টেকনাফ থেকে নেপাল পর্যন্ত হিমালয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত গঠিত হয়েছিল।