যশোরের দুঃখ ‘ভবদহ’

‘আমাগের জন্য কিছু নিয়ে আইছেন?

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:৩৩ পিএম

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার জলাবদ্ধ কুলটিয়া গ্রামের রীতা মন্ডল বসেছিলেন নৌকায়, পাশে পানিতে মাছ ধরছিলেন স্বামী আনন্দ মন্ডল ও কিশোরী মেয়ে। অপর একটি নৌকায় শহরের মানুষ দেখে বললেন, আমাগের জন্য কিছু নিয়ে আইছেন? সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বললেন, একটু জায়গায় কয়ে দিয়েন, আমাগের জন্য যেন কোনো ব্যবস্থা করে। এই দেখেন জলে ভিজে হাত-পায়ের কী অবস্থা? পচন ধরেছে। সারদিনে একবার খাই।

আর একটু এগিয়ে দেখা গেল চতুর্দিকে পানি বেষ্টিত একটি ঘরে উঁচুতে খাট বেঁধে পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে বসে আছেন স্বপ্না শিকদার। বললেন, ‘ঘর-বাড়ি ভেঙে পড়তেছে। অনেক কষ্টে রান্না করে খাচ্ছি আমরা। আমাগের এই কষ্টের জল যেন আর না হয়, আমরা তাই চাই। আমরা আর কিছু চাই না, আমাগের এই জলডাই শুকিয়ে দেন।’

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী আব্দুল হামিদ জানান, গত ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে অবিরাম বৃষ্টি হয়েছিল তাতে কেশবপুর, মনিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ২শ’ গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ অঞ্চলের ২৭ বিলের পানি স্বাভাবিক গতিতে বের হতে না পেরে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামগুলোর ঘর-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট পানিবন্দি।

তিনি জানান, মনিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগর উপজেলার জলাবদ্ধ ইউনিয়নগুলো হচ্ছে মঙ্গলকোট, বিদ্যানন্দকাটি, কেশবপুর, পাজিয়া, সুফলাকাটি, গৌরিঘোনা, হরিদাসকাটি, সুন্দলী, চলশিয়া, পায়রা, কুলটিয়া, মনোহরপুর, দুর্বাডাঙ্গা ও শ্যামকুড়।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি বৃহস্পতিবার যশোরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে সাক্ষাৎ করে ওই এলাকার দুরাবস্থার কথা জানিয়ে কী প্রতিকার তা জানতে চান। গাজী আব্দুল হামিদ জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী তাদেরকে জানিয়েছেন, তিনি ২৪ ঘণ্টা এ বিষয়ে খোঁজ রাখছেন।

হামিদ বলেন, এলাকার মানুষ এই শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী করেছেন যশোর-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য চাঁদ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। তাদের অভিযোগ, টিআরএম প্রকল্প বাঁধ দিয়ে ২০২২ সাল থেকে স্বপন ভট্টাচার্যের মদদে পানি উন্নয়ন বোর্ড যে সেচ প্রকল্প গ্রহণ করেছিল তাই এখন ভোগান্তির কারণ। অথচ ২০২২ সালের ২ জানুয়ারি ও ১৫ নভেম্বর ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার সেচ প্রকল্প ও প্রস্তাবিত প্রায় ৪৫ কোটি টাকার ‘ভবদহ ও তৎসংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ’ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে যশোরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছিল ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।

মনিরামপুরের মশিহাটী গ্রামের শেখর বিশ্বাস বলেন, স্থানীয়দের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভবদহ সেচ পাম্প প্রকল্প গ্রহণ করে। তখন আমরা বলেছিলাম জলাবদ্ধতা নিরসনে এই প্রকল্প কোনো কাজে দেবে না। বৃষ্টি হলেই আবার সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতা। গত ২/৩ বছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি কম ছিল। কিন্তু এ বছর স্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমাদের আশঙ্কাই সত্য হলো।

স্থানীয় বলিদাহ-পাঁচাকড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হারুন-অর-রশিদ বলেন, তিন উপজেলার ২৭ বিলের পানি নিষ্কাশিত হয় ভবদহের ২১, ৯ ও ৩ ভেন্টের স্লুইস গেট দিয়ে হরি নদীতে গিয়ে পড়ে। কিন্তু পলিতে স্লুইস গেটগুলো অচল হয়ে থাকায় পানি যাচ্ছে না। বর্তমানে আবার স্লুইস গেটগুলো বন্ধ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড সেচ পাম্প বসিয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না। কারণ পানি নিষ্কাশনের খাল থেকে নদী উঁচু। সে কারণে প্রায় এক মাস ধরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

একই বিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষক আব্দুস সবুর বলেন, নদী খনন না করলে এ পানি কমবে না। সেচ করে এ জলাবদ্ধতার পানি কমানো যাবে না। টিআরএম প্রকল্প ছিল একমাত্র পরিত্রাণের উপায়। কিন্তু পলি জমে এখন যে অবস্থা তাতে নদী খনন করা ছাড়া উপায় নেই।

কপালিয়ায় তিনভেন্ট এলাকার রাম প্রসাদ সরকার বলেন, পানির চাপে সেচ কোনো কাজে দিচ্ছে না। নদীর তলা উঁচু থাকায় পানি উপচে বাড়িতে ঢুকছে।

পানি বাড়তে থাকায় স্থানীয়রা রাস্তার ওপর ঘর বেঁধে গবাদি পশু নিয়ে রাখছেন। কপালিয়া থেকে মশিহাটী পর্যন্ত যেতে এ অবস্থা দেখা যায়। রাস্তার ওপর তৈরি গোয়াল ঘরে গরুকে খাবার দিচ্ছিলেন সুষমা সরকার। বললেন, এতো কষ্টে বেঁচে থাকা যায়!

পানিয়াল গ্রামের রাজু আহমেদ জানালেন, প্রায় এক মাস জলাবদ্ধতা আমাদের অঞ্চলে। এরপর চারদিন যে বৃষ্টি হয়েছে তাতে জলাবদ্ধতা আরও বেড়েছে।

এ এলাকায় নৌকায় যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছে। এ জন্য নৌকা কিনে নিয়ে যেতেও দেখা যায় অনেককে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বলেছেন, জলাবদ্ধ অঞ্চলের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কাজ চলছে। এ জন্য ৯টি পাম্প চলছে। এছাড়া পাম্পের পানি পড়ে পলিতে নদীর যে স্থান উঁচু হয়ে আছে সেই ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার খনন শুরু হয়েছে। ভবদহের ডহুরি স্লুইস গেট এলাকায় এ খনন কাজ চলছে।

তিনি আরও জানান, ভবদহ হয়ে যশোর শহরের পানিও নামে। বর্তমানে যে পানি নামছে তা যশোরের হরিণার বিলে আবদ্ধ থাকা পানি। এই পানি নেমে যাওয়ার পর ভবদহ এলাকার আবদ্ধ পানি নিষ্কাশন হওয়া শুরু হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা বলেন, এ বছর যশোরে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। শুধুমাত্র ২৬ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ৬২৩ মিলিমিটার। হঠাৎ করে এতো বৃষ্টি হওয়ায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত