অস্তিত্বহীন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ, ব্যয় শুধু কাগজে-কলমে

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:৩০ পিএম

২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপি ও রাজস্বের অর্থায়নে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় অন্তত নয়টি প্রকল্পে ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় জেলা পরিষদ। তবে নয়টি প্রকল্পের মধ্যে ছয়টিরই নেই কোনও অস্তিত্ব। বাকি তিনটির অস্তিত্ব খু্ঁজে পাওয়া গেলেও দায়িত্বপ্রাপ্তরা পাননি কোনও বরাদ্দের টাকা বা সমমূল্যের মালামাল। ব্যয় হয়েছে শুধু কাগজে কলমে।

নামে বেনামে প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের এমন অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে অনুসন্ধানে। উপজেলা প্রশাসনের তদন্তেও বেরিয়ে এসেছে এমন চিত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, তৎকালীন সরকারের দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের যোগসাজশে এমন অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে। যার মূল হোতা সদ্য বাতিল হওয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপির অর্থায়নে যদুবয়রা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের সাথী সংঘ পাঠাগার নামক প্রতিষ্ঠানকে এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয় জেলা পরিষদ। তবে গত ১৭ নভেম্বর দুপুরে সরেজমিন গিয়ে এর কোনও অস্তিত্বই মেলেনি। সেখানে রয়েছে একটি চায়ের দোকান।

এ সময় মৃত রহিম সরদারের ছেলে ও সাথীসংঘ পাঠাগারের দাতা সদস্য মান্নান সরদার (৬০)  জানান, আমার বাবা সাথী সংঘের নামে পাঁচ কাঠা (প্রায় সাড়ে আট শতাংশ) জমি দিয়েছিলেন ১৯৭৬ সালের দিকে। তবে প্রায় ২২ বছর আগে থেকেই এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে। এখন পাঠাঘরের স্থানে চায়ের দোকান বসিয়েছি।

একই অর্থবছরে যদুবয়রা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল, ভলিবল ও খেলার সামগ্রী বাবদ রাজস্বের অর্থায়নে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় জেলা পরিষদ। এক লাখ টাকার বিপরীতে বিদ্যালয়ে মাত্র দুইটি ফুটবল দিয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি যুবলীগ নেতা ও যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান।

'বরাদ্দ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছেন ইউএনও।' এ কথা বলেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক। তিনি বলেন, 'শুনেছি এক লাখ টাকা বরাদ্দ। কিন্তু চেয়ারম্যান মাত্র দুটি ফুটবল দিয়েছেন বিদ্যালয়ে।'

তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, কিছু খেলার সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। অর্থবছরের মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে আরও খেলার সামগ্রী কিনে বিদ্যালয়ে দেওয়া হবে।

যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের পেছনে রয়েছে প্রত্যাশা ক্লাব ও পাঠাগার নামক একটি প্রতিষ্ঠান। ২০০৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবুও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন বাবদ এক লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় জেলা পরিষদ। সরেজমিনে দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনশেডে আধাপাকা ঘরের ক্লাবটির দরজায় ঝুলছে তালা। খোলা জানালা দিয়ে দেখা যায়, ফাঁকা ঘরের ভেতরে একটি করে টেবিল, চেয়ার ও বেঞ্চ।

এ সময় যদুবয়রা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চৌরঙ্গা কলেজের শিক্ষক নুরুল ইসলাম আসাদ বলেন, সরকার প্রকল্প দেয় উন্নয়নের জন্য। কিন্তু সরকার দলীয় অসাধু নেতাকর্মীরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করে। এদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে আরও জানা গেছে, একই অর্থবছরে এডিপির অর্থায়নে উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের গোবরা চাঁদপুর শেখ রাসেল স্পোর্টিং ক্লাব উন্নয়নে এক লাখ টাকা, শিলাইদহ ইউনিয়নের দারুচ্ছালাম দাখিল মাদ্রাসা উন্নয়নে এক লাখ টাকা, রাজস্বের অর্থায়নে চাঁদপুর শেখ কামাল যুবসংঘ ক্লাব উন্নয়নে এক লাখ টাকা, জগন্নাথপুর ইউনিয়নের মহেন্দ্রপুর ক্লাব উন্নয়নে এক লাখ ৫০ হাজার, চাপড়া ইউনিয়নের বাঁধবাজার শেখ রাসেল স্মৃতি পাঠাগার উন্নয়নে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় জেলা পরিষদ। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এছাড়াও একই অর্থবছরে উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের সাঁওতা যুব ও ক্রীড়া সংঘের আসবাবপত্র উন্নয়ন বাবদ এক লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত পাইনি বরাদ্দকৃত অর্থ বা মালামাল। কে কীভাবে টাকা তুলেছেন তাও জানেন না প্রতিষ্ঠানটির কেউ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কলেজ শিক্ষক জানান, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খানের জেলাজুড়েই অনিয়ম দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ছড়াছড়ি রয়েছে। বিশেষ করে খোকসা উপজেলায় জেলা পরিষদের জায়গা বরাদ্দে অনিয়মের কোনও শেষ নেই। তদন্ত করলে যেখানে হাত দিবেন সেখানেই অনিয়ম পাবেন।

ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় জেলা পরিষদের বরাদ্দকৃত প্রকল্প যাচাই-বাছাই করে পাঁচটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার যেগুলোর অস্তিত্ব আছে, সেগুলো বরাদ্দকৃত অর্থ বা মালামাল পাইনি। এই মর্মে তদন্ত প্রতিবেদনটি কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপি ও রাজস্ব তহবিলের আওতায় ৫০৩টি প্রকল্পে প্রায় ১০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হাতে নেয় কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ। যার অধিকাংশ প্রকল্পেরই নেই অস্তিত্ব, আর যেগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে সেগুলোও পায়নি বরাদ্দ। শুধু ব্যয় হয়েছে কাগজে-কলমে। যার প্রমাণও মিলেছে। 

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে। অনিয়ম পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত