জুলাই মাস এলেই কক্সবাজারের পেকুয়ার মেহেরনামা বাজারপাড়ার ছোট্ট বাড়িটিতে নেমে আসে অদ্ভুত নীরবতা। দেয়ালে টাঙানো ছেলের ছবির সামনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকেন বাবা শফিউল আলম। মা জ্যোৎস্না বেগম ছবির ধুলো মুছতে মুছতে চোখের জল আড়াল করেন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের কাছে সময় যেন থেমে আছে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত বিকেলে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরাম। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে শহরের মুরাদপুর এলাকায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সেই মৃত্যু শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের বহু বছরের লালিত স্বপ্ন।
দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন ওয়াসিম। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ছিলেন মেধাবী। পরিবারের স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য ওয়াসিম যাবেন কানাডায়। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। ওয়াসিমের মৃত্যুর তিন মাস পর প্রকাশিত সমাজবিজ্ঞান (অনার্স) তৃতীয় বর্ষের ফলাফলে দেখা যায়, তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। যে ফল দেখে পরিবার আনন্দে ভাসার কথা ছিল, সেটিই হয়ে ওঠে তাদের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটি।
ভারাক্রান্ত কণ্ঠে শফিউল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলে বিদেশে গিয়ে পড়বেÑ এটাই ছিল আমাদের স্বপ্ন। এখন সেই ছেলের জন্য দোয়া করতে কবরে যেতে হয়। ওর স্বপ্ন ছিল কানাডায় উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। আমারও ইচ্ছা ছিল তাকে বিদেশে পাঠাব। এখন আর কোনো চাওয়া নেই। শুধু চাই, আমার মতো যেসব মা-বাবা সন্তান হারিয়েছেন, সবাই যেন ন্যায়বিচার পান।’
মা জ্যোৎস্না বেগমের প্রতিটি সকাল শুরু হয় ছেলের ছবি দেখে। ঈদ, জন্মদিন কিংবা পরিবারের যেকোনো আনন্দঘন মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় ওয়াসিমের অনুপস্থিতি। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘরের অনেক কিছু এখনো আগের মতোই সাজানো আছে।
জ্যোৎস্না বেগম বলেন, ‘কখনো কখনো মনে হয়, দরজা খুলে বুঝি ওয়াসিম ঢুকে বলবে, মা, আমি এসেছি। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর কখনো পূরণ হওয়ার নয়।’ ওয়াসিমের সহযোদ্ধা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘প্রথমে ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকায় কর্মসূচির পরিকল্পনা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তা মুরাদপুরে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যেই আন্দোলন চলছিল। একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামনে গুলিবিদ্ধ হন ওয়াসিম। তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওর মৃত্যুর খবর শুনে মনে হয়েছিল, নিজের ছোট ভাইকে হারিয়েছি।’
নোমান বলেন, ‘ওয়াসিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভ দ্রুত নগরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং জুলাই আন্দোলনের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ওয়াসিমের শাহাদাত আন্দোলনে নতুন শক্তি জুগিয়েছিল।’
দুই বছর পরেও পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। তাদের দাবি, শুধু ওয়াসিমের নন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো প্রতিটি শহীদের হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে যখন দেশ শহীদদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে, তখন ওয়াসিমের বাবা-মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তাদের ছেলের হত্যার বিচার কবে হবে?
