দাম্পত্য কলহের রক্তাক্ত পরিণতি

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৬ এএম

রাজধানীর কলাবাগানের ক্রিসেন্ট রোডের ‘শীতল নিবাসে’ গতকাল রবিবার সকালে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক জোড়া খুনে পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দাম্পত্য কলহের জেরে এক যুবক তার স্ত্রী ও শাশুড়িকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই যুবক থানায় গিয়ে হত্যাকা-ের কথা স্বীকার করলে পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুসারে মা ও মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কাঁঠালবাগানের আল-আমিন জামে মসজিদের পাশের একটি বাসায় এই ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেনÑ ফারজানা আক্তার রাত্রি ও তার মা ফিরোজা বেগম। অভিযুক্ত হৃদয় ওরফে শিপন নিহত রাত্রির স্বামী।

কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে আশিক জানান, প্রাথমিকভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহের জেরে তর্ক-বিতর্ক শুরু হলে রাত্রির মা ফিরোজা বেগম ঝগড়া থামাতে এগিয়ে আসেন এবং মেয়ের পক্ষ নেন। এতে হৃদয় ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রথমে স্ত্রী ও পরে শাশুড়িকে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই রাত্রির মৃত্যু হয়। ফিরোজা বেগমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওসি জানান, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। ফিরোজা বেগমের শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আঘাতের ধরন, মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এবং হামলার প্রকৃতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

রাত্রির বাবা ফারুক হোসেন জানান, তাদের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায়। গত সপ্তাহে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। তার এক ভাতিজার বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শিপনও সেখানে যান। তবে বিয়ের দিন সকালে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিপন কোনো খাওয়া-দাওয়া না করেই ঢাকায় ফিরে আসেন।

ফারুক হোসেন বলেন, “রাত্রির মা আমাকে জানান, মেয়ের সঙ্গে কী যেন ঝামেলা হয়েছে, পরে শিপন চলে গেছে। আমি তাকে ফোন দিলে সে (শিপন) যাবে না বলে জানায় এবং বলে ‘আমাকে মালিক ফোন দিছে আমার ট্রিপ আছে এ জন্য আমি চলে এসেছি।’ পরে জানতে পারি নেশাগ্রস্ত দুই বন্ধুকে নিয়ে বিয়ে বাড়িতে যাওয়ায় মেয়ের সঙ্গে শিপনের কথাকাটাকাটি হয়।”

তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি বাসার বাইরে ছিলেন। প্রতিবেশীর ফোনে খবর পেয়ে দ্রুত বাসায় ফিরে দেখেন, তার মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন এবং স্ত্রী গুরুতর আহত। পরে তিনি আহত স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বাসায় পৌঁছানোর পরই ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে হাজির হয়। পরিবারের সদস্যদের এই বর্ণনা পুলিশের প্রাথমিক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও তদন্তকারীরা প্রত্যেক সাক্ষীর বক্তব্য আলাদাভাবে যাচাই করছেন।

ফিরোজা বেগমের ৮ বছরের ছেলে প্রত্যক্ষদর্শী ইয়ামিন বলে, ‘দুলাভাই আমার বোনকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, আর মা সকালের নাস্তা রেডি করছিল। এ সময় বোনের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় হৃদয় ভাইয়ের। সে আমার সামনে রাত্রি আপুকে ও আম্মাকে কোপায়। আমি ভয়ে ছাদের চিপায় গিয়ে লুকিয়ে ছিলাম। কতক্ষণ পরে বের হয়ে দৌড়ে নিচে গিয়ে খালাকে জানাই, পরে বাবাকে জানাই। বাবা যখন উপরে যান, তখন আমি নিচেই ছিলাম। পরে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।’

ঘটনার পরপরই কলাবাগান থানা পুলিশ অভিযুক্ত হৃদয় ওরফে শিপনকে আটক করে। তদন্ত কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করছেন। পুলিশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য জানাতে পারেনি। তবে পারিবারিক কলহের কারণই এই হত্যাকা- বলে ধারণা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, এমন ঘটনায় সাধারণত দাম্পত্য সম্পর্ক, পূর্বের বিরোধ, পারিবারিক যোগাযোগ, মোবাইলের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়। তদন্তে এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে।

রাত্রির মামাতো ভাই মো. ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, হৃদয়ের সঙ্গে রাত্রির ৬ থেকে ৭ বছর আগে পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই নেশাগ্রস্ত হৃদয় রাত্রিকে মারধর শুরু করেন। বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা জানতে পেরে হৃদয়ের কাছ থেকে রাত্রির তালাক নিয়ে নেন। সর্বশেষ আবার পরিবারের হস্তক্ষেপে নতুন করে তাদের বিয়ে হয়। তাদের ঘরে দেড় বছর বয়সী একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। তিনি বলেন, রাত্রি তার স্বামী হৃদয়ের সঙ্গে মোহাম্মদপুর এলাকায় থাকতেন। গত শনিবার হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে কলাবাগানে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। গতকাল সকালে ফারুক হোসেন ও তার বড় ছেলে আল-আমিন ফলের দোকানে চলে গেলে এই ঘটনা ঘটায় হৃদয়। রাত্রির দুই ভাই রয়েছে।

এদিকে সরেজমিন কলাবাগানের ওই বাসায় দেখা যায়, পাঁচতলা ভবনের পাঁচতলায় একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন রাত্রির পরিবার। ফ্ল্যাটের দরজার মুখে পুলিশি পাহারা বসানো। ভেতরে সাধারণ কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না পুলিশ। ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটকে কাজ করতে দেখা যায়। দরজা থেকে উঁকি দিয়ে দেখা যায়, বাসার ফ্লোরে রক্তের দাগ রয়েছে।

সুরতহাল প্রতিবেদনে যা আছে : নিহত ফিরোজা বেগমের গলা, বাম হাতের আঙুল, কাঁধের ডান পাশে, ডান হাতের আঙুলে গভীর ক্ষত রয়েছে। পারিবারিক কলহের জেরে শাশুড়ি ফিরোজাকে ছুরিকাঘাতে গুরুতর জখম করা হয়। তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে রাত্রির গলা কাটা, বাম কান, বাম গাল ও বাম কানের পেছনে ঘাড়ে কাটার চিহ্ন রয়েছে। পারিবারিক কহলের জেরে রাত্রিকে ছুরিকাঘাতে খুন করেন হৃদয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত