পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় বিপর্যয়, দলীয় বিদ্রোহ এবং গণপদত্যাগের জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস তার তিন দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। চলতি বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনে গুটিয়ে যায় এবং বিজেপি ২০৮টি আসন নিয়ে প্রথমবার সরকার গঠন করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার নিজস্ব দুর্গ ভবানীপুর আসনেও পরাজিত হন। এই ভরাডুবির পর থেকেই দলটিতে নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভাঙন শুরু হয়েছে।
একসময় কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তুলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঝড় তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর এখন সেই দলই সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে আলোচনা চলছে।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, কোনও রাজনৈতিক দলের মৃত্যুপরোয়ানা এত সহজে লিখে ফেলা যায় না। রাজনৈতিক দল অনেকটা ‘রোজ অব জেরিকো’ নামের মরুভূমির উদ্ভিদের মতো। বছরের পর বছর প্রতিকূল পরিবেশে শুকনো বলের মতো টিকে থাকে, আবার সামান্য আর্দ্রতা পেলেই নতুন করে ফুল ফোটায়। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক ‘জোড়া ঘাসফুল’ কি দলটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে?
এই প্রশ্নই এখন পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ঘুরছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কি আগামী পাঁচ বছর টিকে থেকে ২০২৯ সালের লোকসভা এবং ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির মোকাবিলা করতে পারবে? পূর্ব ভারতের এই রাজ্যে বিজেপি এখন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের ভেতরে ভাঙনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, তৃণমূলের কিছু বিদ্রোহী নেতা সম্প্রতি বৈঠক করেছেন। তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাতিজা ও দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করছেন। আর এই অভিযোগেই তৃণমূল দুই বিধায়ক— সন্দীপন সাহা ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও বিধায়ক কুণাল ঘোষ বিদ্রোহে প্ররোচিত হওয়া বিধায়কদের উদ্দেশে ‘জোড় হাতে’ অনুরোধ জানিয়েছেন। অন্যদিকে ফেসবুক লাইভে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও স্বীকার করেন, তৃণমূলে ভাঙন ধরানোর একটি ষড়যন্ত্র চলছে।
১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন তার বয়স ছিল চল্লিশের কোঠায়। এখন ৭১ বছর বয়সে তাকে নিজের হাতে গড়া তিন দশকের পুরোনো দলকে ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।
এই ৩০ বছরের মধ্যে ১৫ বছর দলটি ক্ষমতায় ছিল। আর এটিই এতদিন মমতার কাজ সহজ করে রেখেছিল। পশ্চিমবঙ্গের গত ৫০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ক্ষমতা হারানোর পর কোনও দল আর রাজ্যে সরকার গঠন করতে পারেনি।
ব্যতিক্রম ছিল কংগ্রেস, তবে সেটিও ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার আগের ঘটনা।
তৃণমূল নেতৃত্বের একটি বড় অংশই অভিনয় ও ক্রীড়াজগতের পরিচিত মুখ। ভোট টানতে পারবেন— এই বিবেচনায় তাদের প্রার্থী করা হয়েছিল। অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তারাও জিতেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এদের অনেকেরই দলের প্রতি গভীর আদর্শগত অঙ্গীকার নেই। ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে তারা সহজেই অন্য দলে চলে যেতে পারেন। অনেকের মতে, তৃণমূলের নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক আদর্শের অভাবও এর একটি কারণ। ফলে দলের নেতাদের শিকড় দুর্বল, আর রাজনৈতিক ঝড়ে তারা সহজেই ভেসে যেতে পারেন।
কলকাতার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শিখা মুখার্জি ‘দ্য লল্লানটপ’-এর ‘নেতানগরী’ অনুষ্ঠানে প্রয়াত তৃণমূল নেতা সুব্রত মুখার্জির সঙ্গে বহু বছর আগের একটি কথোপকথনের কথা তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ‘আমি একবার সুব্রত মুখার্জিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তৃণমূল কংগ্রেস আসলে কী? তিনি বলেছিলেন— এটি শিকড়হীন একটি গাছ।’
মূলত গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলে অস্থিরতা শুরু হয়। বর্তমানে ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপির আসন ২০৮টি। বিপরীতে তৃণমূলের আসন মাত্র ৮০টি। ফলে বিধায়কদের ওপর মমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভিসা নিয়মে পরিবর্তন আনল ভারত